সর্বোচ্চ আদালতে বিএনপিপন্থীদের নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি এগিয়ে আনার দাবিতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা প্রায় তিন ঘণ্টা আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে অবস্থান নিয়ে তুমুল হট্টগোল করেছেন।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় বিচারকের আপিল বেঞ্চে বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন আবেদনের ওপর শুনানির পর থেকে এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে আর কোনো মামলার কার্যক্রম চালানো যায়নি।
এই পুরোটা সময় আদালতকক্ষ থেকে বের হতে বা নতুন করে কাউকে ঢুকতে বাধা দেন বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা। এজলাস কক্ষেই তারা স্লোগান দেন- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘বেইল ফর খালেদা জিয়া’।
বার বার চেষ্টা করেও বিচার কার্যক্রম শুরু করতে না পেরে দুপুর সোয়া ১টার দিকে এজলাস থেকে নেমে যান বিচারকরা।
বিশৃঙ্খলায় ক্ষুব্ধ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘বাড়াবাড়ির’ একটা সীমা থাকা দরকার, এটা ‘নজিরবিহীন’।
বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের এই আচরণকে ‘ন্যক্কারজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে তাদের বিরুদ্ধে ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার’ দাবি জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
খালেদার জামিন আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে গত ২৮ নভেম্বর তার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা জানতে মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন চেয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ওই মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার আদালতে আসার কথা ছিল।
কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বৃহস্পতিবার সকালে শুনানির শুরুতেই বলেন, খালেদা জিয়ার কিছু পরীক্ষা হয়েছে, কিছু পরীক্ষা বাকি আছে। সেজন্য সময় প্রয়োজন বলে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

প্রধান বিচারপতি এ সময় আগামী ১২ ডিসেম্বর শুনানির পরবর্তী তারিখ রেখে তার আগেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা তখন শুনানির তারিখ এগিয়ে আনার দাবিতে আদালতকক্ষের ভেতরে হৈ চৈ শুরু করেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, ব্যরিস্টার মওদুদ আহমদ, মাহবুব উদ্দিন খোকন ও নিতাই রায় চৌধুরী এ সময় জুনিয়র আইনজীবীদের হট্টগোলের মধ্যে আদালত কক্ষে আটকা পড়েন।
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেলসহ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ছাড়াও বার সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন, আজমালুল হোসেন কিউসি, ফজলে নূর তাপস, কামরুল ইসলাম আটকা পড়েন আদালত কক্ষে।
কয়েকবার চেষ্টার পরও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা শান্ত না হওয়ায় বিচারকরা সকাল সোয়া ১০টার দিকে এজলাস থেকে নেমে যান। ফলে আপিল বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে।
কিছুক্ষণ পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উত্তর হলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের ব্রিফিংয়ে আসেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন, আবদুল মতিন খসরু, শেখ ফজলে নূর তাপসসহ সরকার সমর্থক আইনজীবীরা।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ‘বাইরের আন্দোলনকে আদালতের এজলাসে’ এনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
“তাদের বিশৃঙ্খলার জন্য আদালত আজকে একটি সময় উঠে যেতে বাধ্য হয়েছে। তারা আদালতের কার্যক্রমও ঠিকমতো চালাতে দেয়নি।”
আদালতের ওপরে ‘অবৈধ চাপ’ সৃষ্টির জন্য বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন মন্তব্য করে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে তারা আজকে, এটা অভাবনীয়। এই বয়সে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা এর আগে আমি দেখিনি। তারা আদালতকে অবমাননাকর অবস্থায় নিয়ে গেছে, জনসভায় হট্টগোল হয়, সেরকম হট্টগোল তারা আদালতে করেছে।”
বিএনপিপন্থিদের আচরণকে ‘অতি ন্যক্কারজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে মাহবুবে আলম বলেন, “এভাবে তারা যদি আদালতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে আমি প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানাব, এদের বিরুদ্ধে উপযযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।”
সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন অভিযোগ করেন, এজলাসে আইনজীবীদের পোশাকে যারা এসেছিলেন, তাদের অনেকেই আইনজীবী নন।
“তারা আইনজীবী ছিল না। তারা অনেকেই কালো কোট পরে আসছে, তারা বহিরাগত ছিল। তারাই কিন্তু এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, আইনজীবীরা এ ধরনের স্লোগান দিতে পারে না। আইনজীবীদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “এ ধরনের বহিরাগতদের আদালত অঙ্গন থেকে বহিষ্কার করেন। আদালতের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনুন।”
বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সমালোচনা করে আমিন উদ্দিন বলেন, “আদালতকে মানে না, সুপ্রিম কোর্টকে অবজ্ঞা প্রকাশ করে। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। আমি মনে করি, এ ধরনের আচরণ আবার করলে যথোপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
সরকার সমর্থক আইনজীবীদের এই ব্রিফিংয়ের সময়ও আপিল বিভাগের এজলাসের ভেতরে বিএনপি সমর্থকদের হৈ চৈ স্লোগান চলছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপির আইনজীবীদের মধ্যে ক্যান্ডি বিতরণ করেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন।
এর কিছুক্ষণ পর বিচারকরা এজলাসে ফিরে এলে আদালতের কর্মচারীরা কার্যতালিকার পরবর্তী মামলার নম্বরগুলো ডাকতে শুরু করেন।
বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা খালেদার জামিন শুনানি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আমরা এখন আর অন্য কিছু শুনব না। সব কিছুর একটা সীমা থাকা দরকার, বাড়াবাড়ির একটা সীমা থাকা দরকার। এটা নজিরবিহীন। আমি এর আগে আদালতের এই পরিস্থিত দেখিনি।”
খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন এ সময় ডায়াসের দিকে এগিয়ে গেলে তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “প্লিজ, টেইক ইয়োর সিট।”

জয়নুল আবেদীন তখন বলেন, “অনেক কথাই তো বলা যায়-সরকারপ্রধান বলেছেন, খালেদা জিয়া রাজার হারে আছেন।”
তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “কে কী বললো তা দেখে আমরা বিচার করি না। মামলার কাগজপত্র দেখে আমরা বিচার করব।”
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনও যে বিভিন্ন মামলায় আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আপনার বিরুদ্ধে কয়টা মামলা? কোর্ট থেকেই তো জামিনে আছেন। আবার কোর্টে এসেই শক্তি দেখাচ্ছেন। আমরা এটা নিয়ে আর কথা বলব না, অন্য আইটেম দেখব।”
খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব কথা বলতে চাইলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, “অর্ডার হ্যাজ বিন পাসড।”
এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনও। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “মাই লর্ড, এক মিনিট, অর্ডারটা রিভিউ করেন, দয়া করেন।”
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এ সময় বলেন, “খালেদা জিয়া মারা যাচ্ছেন, অর্ডারটা রিভিউ করেন।”
প্রধান বিচারপতি বলেন, “সবাই বলছেন, আগামী বৃহস্পতিবারের আগে শুনতে পারবেন না। আমরা আর কোনো কথা শুনব না।”
বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিএনপিপন্থি জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এজলাস কক্ষ থেকে বের হতে চাইলেও জুনিয়রদের বাধার মুখে আবার আসনে ফিরে যান।
এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুব আলম, আইনজীবী জমালুল হোসেন কিউসি, আবদুল মতিন খসরু, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা, ফজলে নূর তাপস এগিয়ে গিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বেরিয়ে যেতে অনুরোধ করেন।
কিন্তু তাতে সাড়া না দিয়ে স্লোগান, হৈ চৈ চালিয়ে যান খালেদা জিয়ার সমর্থকরা। একটি মামলার শুনানি শুরুর চেষ্টা হলেও পরে তা মুলতবি করেন প্রধান বিচারক। খালেদা জিয়ার মামলার পর আর কোনো মামলার শুনানিই এদিন চালানো যায়নি।

লম্বা সময় এজলাসে অপেক্ষা করেও বিশৃঙ্খলার কারণে বিচার কার্যক্রম চালাতে না পেরে বেলা সোয়া ১টার দিকে এজলাস ছাড়েন বিচারকরা। এরপর বিএনপিনন্থি আইনজীবীরাও স্লোগান দিতে দিতে ধীরে ধীরে আদালত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।

শেয়ার