‘আগুনে পুড়ে’ সন্তানদের আলোকিত করছে মায়েরা

নুসরাত জাহান
যশোর শহরের খড়কী মসজিদের পাশে শিমু ছাত্রাবাসে কাজ করেন মরিয়ম বেগম (৪০)। ভোরের সূর্য উঠুক আর নাই উঠুক তাকে ঘুম থেকে উঠতেই হয়। চোখ মুছতে মুছতে যেতে হয় ছাত্রাবাসে। ছাত্রদের ঘুম ভাঙ্গার আগেই খাবার রান্না শেষ করেন তিনি। এরপর বাসায় ফিরে নিজেদের জন্য রান্না করেন। কিছু সময় পরেই আবার ছুটে যান ছাত্রাবাসে। দুপুরের রান্না করেন। পরে বাসায় ফিরে নিজেদের জন্য দুপুরের খাবার প্রস্তুত করেন। আবার যান ছাত্রাবাসে। সন্ধ্যার দিকে সেখানে রান্না শেষ করে ফেরেন বাসায়। এরপর নিজেদের জন্য রাতের খাবার রান্না করেন মরিয়ম বেগম। এভাবে বছরের প্রতিটি দিন চুলার পাশে বসতে হয় তাকে। তিনি বলেন, স্বামীর কাঁধে সংসারের চাপ না দিয়ে ৫ বছর ধরে এ কাজ করছেন। ৩ ছেলেকে হাফেজি পড়িয়েছেন,তার তিন ছেলেই এখন কুরআনের হাফেজ। তিনি আরো জানান, নিজে আগুনে পুড়ে তাদের আলোকিত করেছি। তাতেই তার সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।
শহরের পীরবাড়ি এলাকায় এক ছাত্রী মেসে কাজ করেন আকলিমা খাতুন (৩৩)। ২ ছেলেমেয়ে, স্বামী এবং শাশুড়ি ৫ জনের সংসার। থাকেন রেললাইন বস্তিতে। ছেলেমেয়ে একজন স্কুলে পড়ে; অন্যজন শিশু। সাতক্ষীরা থেকে যশোরে এসেছেন সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে। স্বামী মাটি কাটে, মাঝেমাঝে রিক্সা চালান। মেসে রান্না করে পান ৩ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে এক সন্তানের স্কুলের খরচ চালান। নিজে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন, কিন্তু ইচ্ছে একটাই সন্তানরা মানুষ হোক।
৫৫ বছর বয়সী রোকসানা যশোর শহরের খড়কী কলাবাগান পাড়ায় স্বামী এবং ছোট সন্তানকে নিয়ে থাকেন। রান্না করেন খড়কী মিজান ছাত্রীবাসে। বড় ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। ছোট ছেলে ৯ম শ্রেণিতে পড়ছে। বললেন, ‘আগে বাড়িতে কাজ করতাম। মাঝে অসুস্থ হলে কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম। স্বামী রিকশা চালায়। কিন্তু কাজে যেতে চায় না। ব্যবহারও খারাপ। কিছু বললেই ঝামেলা করেন। ছেলেটা লেখাপড়া করছে। তার খরচ চালাতে মেসে কাজ নিয়েছি। মাসে মেস থেকে পাই ২৮৮০ টাকা। নিজে কষ্ট করে। ছেলেটাকে মানুষ করতে চাই।’
শহরের আপনমোড়ে প্রীতি ছাত্রীনিবাসে কাজ করেন একই এলাকার হাসিনা খাতুন। তার মেয়ে শিরিনা আক্তার পড়েন সেবাসংঘ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। মেসে রান্না করে যে অর্থ আসে তা মেয়ের লেখাপড়ার খরচেই ব্যয় করেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখাতে তিনি মেসে রান্না করে কিছু টাকা আয় করেন।’