অঘোষিত ধর্মঘটে দুর্ভোগ চরমে

যশোরাঞ্চলে দ্বিতীয় দিনের মত কর্মবিরতিতে
শ্রমিকরা, নেপথ্যে ‘অবৈধরা’

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ যশোরাঞ্চলের ১৮ রুটে সোমবার দ্বিতীয় দিনের মত অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট পালিত হলো। নতুন সড়ক আইন সংশোধনসহ দশ দফা দাবিতে এ অঞ্চলের পরিবহন শ্রমিকরা রাজপথে না নামায় এ ধর্মঘট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোববার রাতে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে গাড়ি চলাচলের প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে অভিযোগ উঠেছে, বৈধ কাগজপত্র না থাকা চালকরা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি পালন করছেন এবং বাকিদেরও রাজপথে না নামতে ইন্ধন দিচ্ছেন। খুলনা বিভাগের সব জেলায় এ অবস্থা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
শ্রমিক সংগঠনের নেতারা দাবি করছেন, শাস্তির খড়গ নিয়ে রাস্তায় নামতে চাইছে না শ্রমিকরা। এজন্য স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। আর বৈধ কাগজপত্রের চালকরা বলছেন, অবৈধ কাগজপত্রের চালকরা গাড়ি নিয়ে রাজপথে নামতে সাহস পাচ্ছে না। তাই শ্রমিক নেতাদের ইন্ধনে তারা ধর্মঘট পালন করছে। এক্ষেত্রে অনেককেই বাধ্য করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন বলছে, শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে ধর্মঘট না হওয়ায় আলোচনা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। তবে আলোচনা চলছে।
জানা যায়, সড়ক আইন- ২০১৮ সংশোধনসহ দশ দফা দাবিতে রোববার সকাল থেকে যশোর অঞ্চলের ১৮রুটে স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরা। এতে ভোগান্তিতে পড়ে হাজারো মানুষ। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা কয়েকটি পরিবহন আটকে দেয় শ্রমিক ও শ্রমিকনেতারা। বৈধ কাগজপত্রের চালকরা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামতে চাইলেও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ওইসব গাড়িরচালকদের দাবি, শ্রমিকনেতারা শ্রমিকদের মাঠে নামিয়ে জিম্মি করছে। এজন্য বৈধ কাগজপত্র থাকলেও অনেক চালক নামতে পারছেন না।
শহরের খাজুরা বাসস্ট্যান্ডে একাধিক যাত্রী বলেন, ঘোষণা ছাড়াই পরিবহন ধর্মঘট চলছে। অথচ কেউ দায় নিচ্ছে না। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা কোনোভাবে মেনে নেয়া উচিত নয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকলে রাস্তার নামার দরকার নেই। কিন্তু যাদের বৈধ কাগজপত্র আছে, তারা কেনো গাড়ি বন্ধ রাখবে। তাদেরকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হোক।
শহরের পালবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে সাইদুল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি কেউ আমলে নিতে চায় না। সবাই নিজেদের ধান্ধায় ব্যস্ত। নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও কঠোর হওয়া উচিত।
যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্রী আফসোনা আফরিন পাঁপড়ি কলেজে যাওয়ার জন্য সোমবার সকালে বেনাপোল বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস পাননি।
তিনি বলেন, “আমি অসুস্থ, তারপরেও জরুরি কাজে কলেজে যেতে হবে। কিন্তু এখন বাসই বন্ধ, যেতে পারছি না।”
যশোর-বেনাপোল ও যশোর-সাতক্ষীরার অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো যাত্রীবাহী বাস চলাচল না করলেও ঢাকা-কলকাতা ও বেনাপোল থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে বলে ঈগল পরিবহনের বেনাপোল অফিসের ব্যবস্থাপক এম আর রহমান জানান।
এছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, মাহেন্দ্র, নসিমন-করিমন জাতীয় ছোট যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে, রোববার দিনভর এ অচলাবস্থার পর রোববার রাতে যশোর কোতোয়ালি থানায় শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঘণ্টাব্যাপী ধর্মঘট নিয়ে আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন সোমবার থেকে পরিবহন চলাচলের সিদ্ধান্ত হয়েছে জানালেও শ্রমিকদের অবস্থান নিয়ে ছিল ধোঁয়াশা।
বাংলাদেশ পরিবহন সংস্থা শ্রমিক সমিতি’র সভাপতি মামুনূর রশীদ বাচ্চু বলেন, বৈধ কাগজপত্রের গাড়ি ও চালকদের বাধা না থাকলেও। ৯০ শতাংশ চালক রাস্তায় নামছে না। ফলে বাকি ১০ শতাংশ চালক বিবেকের তাড়নায় মাঠে নামেনি। সবাই স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি পালন করছে। যদি কেউ বাধ্য করার অভিযোগ করে, সেটি সঠিক নয়।
মামুনূর রশিদ বাচ্চু আরও বলেন, শ্রমিকদের কর্মবিরতি মালিক ও শ্রমিকদের কোনো সংগঠন ডাকেনি। ফাঁসির দড়ি সামনে নিয়ে শ্রমিকরা পরিবহনে কাজ করতে রাজি নয়। তাই তারা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি শুরু করেছে। এটা কোনো ইউনিয়ন বা ফেডারেশনের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নয়। পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছামত কর্মবিরতি শুরু করেছেন।
খুলনা বিভাগীয় শ্রমিক ফেডারশনের যুগ্ম সম্পাদক মোর্তজা হোসেন বলেন, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা সকাল থেকে ‘স্বেচ্ছায়’ কর্মবিরতি করছেন।
“শ্রমিকরা কাউকে ইচ্ছা করে হত্যা করে না। অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য নতুন সড়ক আইনে তাদেরকে ঘাতক বলা হচ্ছে। তাদের জন্য এমন আইন করা হয়েছে যা সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
“নতুন আইনের অনেক ধারার ব্যাপারে শ্রমিকদের আপত্তি রয়েছে। সরকার সমাধানের কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন।” আইন সংশোধনের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মবিরতি চলবে বলে জানান মোর্তজা।
যশোরের পুলিশ সুপার মঈনুল হক সাংবাদিকদের বলেন, রোববার রাতে বৈঠকে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ আশ্বাস দিয়েছিল সোমবার পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করবে। কিন্তু এখানে শ্রমিক কিংবা বাস মালিক সংগঠন নয়, শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কর্মবিরতি পালন করছে। ফলে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না শ্রমিক সংগঠনগুলো। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান, নড়াইল-যশোর, কালনা-নড়াইল-খুলনা, নড়াইল-লোহাগড়া-ঢাকাসহ অভ্যন্তরীণ ৫টি রুটে কোনো ঘোষণা ছাড়া বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। এসব রুটে রোববার (১৭ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরআগে রোববার (১৭ নভেম্বর) বেলা ১১ টায় নড়াইল প্রেসক্লাবের সামনে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর জেল জরিমানা সংশোধনসহ ১১ দফা দাবিতে নড়াইলে পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ মানববন্ধন এবং জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। মানববন্ধনে বক্তারা প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০৪/খ ধারায় মামলা রুজু করা, মটরযান ও চালকেদের ওপর অধিক অর্থদ- ও জেল জরিমানা সংশোধনের দাবি ছাড়াও ১১ দফা দাবি জানান। এর ৭ ঘন্টা পর কোনো ঘোষণা ছাড়াই শ্রমিকরা নড়াইল-যশোর, কালনা-নড়াইল-খুলনা, নড়াইল-লোহাগড়া, নড়াইল-মাগুরা, নড়াইল-নওয়াপাড়া ও নড়াইল-কালিয়া সড়কে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছাদেক আহম্মেদ খান সোমবার (১৮ নভেম্বর) সকাল ১০টায় জানান, বাস বন্ধ রাখার ব্যাপারে সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। কিন্তু আমাদের সাথে আলাপ না করে বাস চালক-শ্রমিকরা নতুন পরিবহন আইনের ভয়ে স্বেচ্ছায় নড়াইল থেকে ছেড়ে যাওয়া খুলনা, যশোর, ঢাকাসহ ৫টি রুটে বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বিক্ষিপ্তভাবে কোনো কোনো রুটে দু’একটি বাস চলছে বলে তিনি জানান।
সাতক্ষীরা থেকে আব্দুল জলিল জানান, সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বাস ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারন যাত্রীরা। পরিবহন শ্রমিক নেতাদের দাবি, আইন সংশোধনের পর এটি বাস্তবায়ন করা হোক। এটা না করা পর্যন্ত আমাদের এ ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।
এদিকে হঠ্যাৎ করেই সাতক্ষীরার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন। তারা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নছিমন, করিমন ও ইজিবাইক যোগে গন্তব্য স্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
জেলা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের প্রতিবাদে শ্রমিকরা বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছে। তারা চান, আগে এটি সংশোধন করা হোক। এরপর এটি বাস্তবায়ন করা হোক। তিনি আরো জানান, শ্রমিকরা বাস চালানো বন্ধ করে দিলে এতে মালিক পক্ষের কিছুই করার থাকে না।

শেয়ার