উপকূল জুড়ে বুলবুল’র ক্ষতচিহ্ন, নিহত ১৪

হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, উপড়ে পড়েছে শত শত গাছ, ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের ক্ষেত

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে উপড়ে গেছে বহু গাছ, বিধ্বস্ত হয়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি। ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলের ক্ষেত। অনেক জায়গায় পোল ভেঙে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে দমকা হাওয়ায় গাছ ও ঘর চাপা পড়ে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে দশ জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা, বরগুনা, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জে দুজন করে এবং পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, মাদারীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটে একজন করে মারা গেছেন।
ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৯টায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল।
পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসার পর সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের কাছ দিয়ে এ ঝড় পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করে। তারপর রোববার ভোর ৫টার দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছায়। বৃষ্টি ঝরিয়ে শক্তি হারিয়ে সকালে বুলবুল পরিণত হয় গভীর স্থল নিম্নচাপে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান দুপুরে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে চার থেকে পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপরে বিভিন্ন জেলা থেকে ঘরবাড়ির পাশাপাশি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এসেছে। এই ঝড়ের কবলে পড়ে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের।
খুলনার দীঘলিয়া এবং দাকোপ উপজেলায় গাছ চাপা পড়ে দুইজনের নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নিহতরা হলেন- দীঘলিয়া উপজেলায় সেনহাটির আলমগীর হোসেন (৩২) এবং দাকোপের প্রমীলা মণ্ডল (৫২)।
বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের এক আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে হালিমা খাতুন নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। ৭০ বছর বয়সী হালিমা ওই ইউনিয়নের বানাই গ্রামের মোজাফ্ফর আলীর স্ত্রী। ঝড়ের কারণে শনিবার ডিএন কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছিলেন তিনি। ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের ডাল কাটতে গিয়ে প্রাণ গেছে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ছোট লবনগোলা গ্রামের বাসিন্দা মহিবুল্লাহর।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে গাছ ভেঙে পড়ে গোপালগঞ্জে দুই জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। নিহতদের মধ্যে সেকেল হাওলাদার (৭০) কোটালীপাড়া উপজেলার বান্ধাবাড়ি ইউনিয়েনের বান্ধাবাড়ি গ্রামের হাসান উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে ও নিহত মাঝু বিবি (৬৭) সদর উপজেলার খাটিয়াগড় গ্রামের মৃত বাবন কাজীর স্ত্রী।
গাছ উপড়ে বসত ঘরের উপর পড়ে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় হামেদ ফকির নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন। নিহত হামেদ ফকিরের বয়স ৬৫ বছর। পেশায় তিনি ছিলেন একজন মৎস্যজীবী। ভোলার ইলিশায় মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় এক জেলের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছে ১৩ জন। ঘূর্ণিঝড়ে শরীয়তপুরে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। নিহত ননী শিকারীর বাড়ি নাজিরপুর উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের লড়া গ্রামে।
মাদারীপুর সদর উপজেলায় ঝড়ো হাওয়ায় ঘর চাপা পড়ে সালেহা বেগম (৪০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সালেহা বেগম সদর উপজেলার ঘটমাঝি গ্রামের আজাদ খাঁয়ের স্ত্রী। বরিশালে গাছের নিচে চাপা পড়ে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। নিহত আশালতা মজুমদার (৬০) উজিরপুর পৌর শহরের এক নম্বর ওয়ার্ডে বাসিন্দা। বাগেরহাটের রামপাল ঘরের উপর গাছ চাপা পড়ে সামিয়া খাতুন নামে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও দুইজন।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে খুলনায় দুইজনের মৃত্যুর পাশাপাশি তিন হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়রা উপজেলায় দেড় হাজার এবং দাকোপ উপজেলায় ১ হাজার ৭৬৫টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া দাকোপ উপজেলায় ৩১৫টি চিংড়ির ঘের ও ৪২৫টি পুকুর ভেসে গেছে। রোববার সকালে খুলনার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন। ঘূর্ণিঝড়ে এই দুই উপজেলার কয়েক হাজার গাছপালা উপড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, ঝড়ে মহানগরেও অনেক বাড়িঘর ও গাছপালা ভেঙে গেছে। গাছ পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয় অনেক সড়কে। বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে গোটা খুলনা জেলা।

দুপুরের পর থেকে বিদ্যুৎ ও সড়ক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে বিকেল থেকে আবার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। মৃদু শীতও অনুভূত হচ্ছে।
সকালে খুলনায় ঝড়ের মধ্যে গাছচাপায় নারীসহ দুই জনের মৃত্যু হয়। এরা হলেন- দাকোপ উপজেলার দক্ষিণ দাকোপ গ্রামের সুভাষ ম-লের স্ত্রী প্রমীলা ম-ল (৫২) এবং দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামের আলমগীর হোসেন (৩৫)।
দাকোপের ইউএনও আবদুল ওয়াদুদ জানান, প্রমীলা শনিবার রাতে দক্ষিণ দাকোপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারে ছিলেন। সকাল ৯টা-সাড়ে ৯টার দিকে নিজের বাড়িতে যান তিনি। “এ সময় একটি গাছ তার উপরে পড়লে প্রাণ হারান প্রমীলা।”
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূল অতিক্রম করার পর সাতক্ষীরায় ঝড়ের দাপট শুরু হয় ভোর পৌনে ৪টার দিকে। প্রবল ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় ভারী বর্ষণ।
সাতক্ষীরা জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করার সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮১ কিলোমিটার।
জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, ঝড়ে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব অঞ্চলে মাছের ঘের ও ফসলি জমির পাশাপাশি রাস্তঘাটেরও ক্ষতি হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে জেলায় ২৫ হাজার হেক্টর আমন ধান, ১২ শ হেক্টর জমির সবজি, ৫০০ হেক্টর জমির সরিষা, ২০০ হেক্টরের কুল ও ১২০ হেক্টর জমির পান নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ বিশ্বাস।
এ জেলায় মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষকে ঝড়ের আগে আশ্রয় কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বিপদ কেটে যাওয়ার পর তাদের অনেকে ফিরে যেতে শুরু করেন। পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজ শুরু করে বলে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন।
বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কামরুল ইসলাম জানান, ঝড়ে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের ৭৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬২টিতে কমবেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগ কবলিত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৩২ হাজার। ঝড়ে এই জেলায় ৩৫ হাজার ৭৭৫টি ঘরবাড়ি আংশিক এবং আট হাজার ৭৮৮টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে বেড়িবাঁধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।। এই বাঁধ মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য করতে চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে জেলার বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা খালেদ কনক।
রাস্তার উপর গাছ পড়ে জেলার তিনটি মহাসড়কে প্রায় চার ঘন্টা যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান মাসুদ।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে ভোলায় ভোর রাতে শুরু হওয়া দমকা হাওয়া ও প্রবল বৃষ্টি সকালের পর কমতে শুরু করে। ঝড়ের প্রভাবে এই দ্বীপ জেলার চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, মনপুরা উপজেলার চর মোজাম্মেল, কলাতলির চর ও তজুমুদ্দিন উপজেলার চর জহিরুদ্দিনের নিন্মাঞ্চল ৩-৪ ফুট পানিতে তলিয়ে যায়।
ঝড়ের প্রভাবে ভোলায় শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। এদের মধ্যে গুরুতর পাঁচজনকে চরফ্যাসন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রোববার সকাল ১১টা থেকে ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বইছে এই জেলায়। ঝড়ো বাতাসে বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়াসহ কয়েকটি ঘর ভেঙে গেছে। বৃষ্টির কারণে প্লাবিত হয়েছে বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী কিছু এলাকা।
বুলবুলের তা-বে বরগুনায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একটি ট্রলারসহ ১৫ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছে। ঘরচাপা ও গাছ পড়ে আহত ১৭ জনকে বরগুনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চাঁদপুরে রোববার বিকেলে বয়ে যায় প্রচ- ঝড়ো হাওয়া। এতে জেলার বিভিন্ন স্থানে বসতঘর ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঝড়ে চাঁদপুর শহরের হাসান আলী হাই স্কুল মাঠে নির্মিতব্য বিজয়মেলা মঞ্চের বেশ ক্ষতিসাধন হয়। এছাড়া সদর উপজেলার আশিকাটি, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বসতঘর ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গোপালগঞ্জে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। কোটালীপাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ঘুর্ণিঝড় বুলবুল বয়ে যাওয়ার সময় কোটালীপাড়ার বান্ধাবাড়িতে সেকেল হাওলাদার নামে এক বদ্ধ গাছচাপা পড়ে নিহত হন।

এছাড়া এ উপজেলায় শতাধিক ঘরবাড়ি, পোল্ট্রি খামার বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার গাছপালা উপড়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে। মৌসুমী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

শেয়ার