ধেয়ে আসছে ‘বুলবুল’, সুন্দরবনে আঘাতের শঙ্কা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। শনিবার (৯ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে বুলবুল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। প্রাথমিকভাবে সুন্দরবন অঞ্চলে আঘাত হানার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। ‘বুলবুল’ আঘাত হানার কারণে ৫ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এ অবস্থায় উপকূলবর্তী এলাকার জনগণকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (৮ নভেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে উপকূলবর্তী সব জেলা ও উপজেলায় প্রায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বাংলাদেশ উপকূলের ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ায় মোংলা ও পায়রায় ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম বন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত জারি হয়েছে।
পাশাপাশি কক্সবাজারে আগের মতই ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় এ ঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।
ওই সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আয়েশা খাতুন বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে সুন্দরবনের কাছ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের খুলনা উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এর প্রভাবে শনিবার সকাল থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে।”

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বিকালে সচিবালয়ে এক প্রস্তুতি সভা শেষে বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি তারা নিয়েছেন।
উপকূলীয় সাত জেলাকে ঝূঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি মাইকিং করে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে।
লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ৫৬ হাজার স্বেচ্ছারসবীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ২০০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার।
ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর জন্য দেশের ৯ জেলায় ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদফতর। এছাড়া চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় পাঁচ জেলায় ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেওয়া হয়েছে। তবে কক্সবাজার থাকবে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেতের আওতায়। এসব অঞ্চলের লোকজনকে নিরাপদে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন ও গবাদিপশু সাইক্লোন শেল্টারে নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় যেখানে আঘাত হানতে পারে সেই এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা ও উপজেলায় এ বিষয়ে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
শুক্রবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’ সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, করণীয় ও প্রস্তুতি বিষয়ক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপকূলের ১৩টি জেলার মধ্যে পাঁচটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝড়ের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। উপকূলবর্তী খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুরসহ ১৩টি জেলায় দুই হাজার করে মোট ২৬ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক জেলায় নগদ পাঁচ লাখ টাকা করে আগাম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন সব উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বুলবুল আরও শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) যেখানে ঘণ্টায় বাতাসের গতিবেগ ছিল ৬২ কিলোমিটার, এখন তা বেড়ে ১১০-১২৫ কিলোমিটার হয়েছে। এই গতি অব্যাহত থাকলে শনিবার (৯ নভেম্বর) খুলনা উপকূল দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বাংলাদেশে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া মোংলা ও পায়রা বন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান বলেন, ‘এখন যে গতি তাতে ঝড়টি বাংলাদেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গতিবেগ আগের চেয়ে বেশি। ঝড়টি এখন যে গতিতে আসছে, তাতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। খুলনা অঞ্চল দিয়ে ঘূণিঝড় প্রবেশের আশঙ্কা করেন তিনি। এছাড়া, ঝড়ের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে শুক্রবারের মতো শনিবারও ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে।’
বুলবুল মোকাবিলায় উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শুকনো খাবার ও ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব জেলায় আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। এসব জেলার সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।

শেয়ার