চৌগাছায় পৈত্রিক পেশায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন কামাররা

অমেদুল ইসলাম, চৌগাছা (যশোর) থেকে ॥ সারাদেশেই ক্ষুদ্র লৌজাত শিল্পের উপর নির্ভরশীল পেশাদার কামার সম্প্রদায়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত যশোরের সীমান্তবর্তী উপজেলা চৌগাছার কামারদের জীবন জীবিকা এখন বিপন্ন হতে চলেছে। কাঁচা লোহা ও উৎপাদনের উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য হ্রাস, ইস্পাত নির্মিত মেশিনে তৈরি জিনিসপত্রের সঙ্গে অসম প্রতিযোগীতা এবং অর্থাভাবসহ নানা প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে তাদের চলতেক হচ্ছে। এরফলে পৈত্রিক পেশায় টিকে থাকা চৌগাছার কর্মকারদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রস্তর যুগের পর দূর অতীতে এই শিল্প ছিল রাজাদের নিয়ন্ত্রণে। কামারশালায় রাজ্য ও রাজপ্রসাদ রক্ষায় অস্ত্র বানানো হতো। অনগ্রসর নৃগোষ্ঠিরাই ছিল এর কর্মী। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে মিসরে কামারশিল্প সম্প্রসারিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মিসর স¤্রাজ্ঞীর সর্বশেষ ক্লিওপেট্রা এবং রোমান স¤্রাট জুলিয়াস সিজার কামারশালাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যান। বিশ্ব সভ্যতার আগমনে কামার শিল্প থেকেই উত্তোরণ ঘটে ফাউন্ড্রি এবং লোহার ভারি শিল্পের। তারপর যন্ত্রযুগে পৃথিবীর এগিয়ে চলা।
সূত্র জানায়, চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা, হয়াতপুর, স্বর্পরাজপুর, মাড়–য়া চৌগাছা সদর, সৈয়দপুর, খড়িঞ্চা, হাকিমপুর, মাধবপুর, পুড়াপাড়া, মাশিলা, বলিদাপাড়া, গরীবপুর, সলুয়াসহ অধিকাংশ গ্রামে এখন বিচ্ছিন্ন ভাবে চোখে পড়ে কামারশালা। কিছু কিছু গ্রাম এলাকার হাটের বড় বৈশিষ্ঠ এই কামারশালা। কামারের কর্মস্থল ছোট্ট একটি ঘর। বেশিরভাগই উন্মুক্ত। কোনটির উপর টিনের চালা, চারিদিকে ফাঁকা, আবার কোনটির উপর টিনের চালও নেই। এরই মধ্যে বসে কামার তার নিখুঁত হাতে তৈরি করছেন লৌহজাত জিনিপত্র। কিন্তু আগের মত আর কাজ হয় না। তাই বাবা দাদার রেখে যাওয়া পেশাকে অত্যান্ত কষ্টে টিকিয়ে রেখেছেন। চৌগাছার পাতিবিলা গ্রামের দিনবন্ধুর ছেলে প্রদীপ কুমার (৩০) পৈত্রিক সুত্রে এই পেশাতে আছেন। দাদা মৃত শুনিল কুমারের হাত থেকে তার বাবা দিনবন্ধু এই পেশাকে বেছে নেন।
তিনি জানান, গ্রামে আর আগের মত আয় রোজগার হয় না। তাই বেশ আগেই তিনি চলে এসেছেন চৌগাছা পৌর সদরে। চৌগাছা-কোটচাঁদপুর সড়কে দেওয়ান মাকের্টের পাশে কামারশালা খুলে বসেছেন। কাক ডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত লোহা পিটিয়ে নানা ধরণের জিনিসপত্র তৈরি করে এ থেকে যা রোজগার হয় তাই দিয়ে চলে প্রদীপের সংসার। প্রদীপ কুমার বলেন, ফসল কাটায় ব্যবহৃত কাচি, পাট কাটার বেকি, লাঙ্গলের ফালা, হাতুিড়, কোদাল, দা, খুন্তা, বটি, ছুরিসহ গৃহস্থলি কাজের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে থাকেন। এসব বিক্রি করেই তার সংসার চলে। আর্থিক অন্টনের কারণে চাহিদা মোতাবেক কাজ করতে পারেন না। প্রদীপ কুমারের মত উপজেলার সকল দরিদ্র কামার পরিবার গুলোর আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় তারা লোহা কিনে জিনিসপত্র উৎপাদন করতে পারছেন না। এরফলে অর্থনৈতিক ভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অর্থাভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বর্তমান বাজারে লৌহার পাশাপাশি আগুন জ্বালানোর জন্য ব্যবহৃত কয়লার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান কামারশালায় নিয়োজিত অনেকে। তারা বলেন, এই পেশার প্রধান উপকরণ হচ্ছে হপার (জাতা)। বর্তমানে একটি হপার ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে, তাও আগের মত ভালো না। হপার শক্ত চামড়া গোলাকৃতি ত্রিকোণা করে নির্দিষ্ট মাপে কয়েকটি ভাঁজে তৈরি। এই হপার মাটির উপর দৃশ্যমান। হপারের নিচে পাইপ বসিয়ে তা মাটির ভেতরে রেখে টেনে নেয়া হয় ৪/৫ ফুট দুরে। হপারের বাতাস পাইপ দিয়ে পৌঁছানো হয় মাটির উপর স্থাপিত ছোট্ট চুল্লিতে। এই চুল্লিতে থাকে কাঠের কয়লা। তাতে আগুন ধরিয়ে হপারের বাতাসে তাপ নিয়ন্ত্রণ ও উস্কে রাখা হয়। এই চুল্লিতে লৌহ রেখে তাপ দিয়ে আগুনের মত রঙ হলে তা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে নানা আকৃতির জিনিসপত্র তৈরি করা হয়। যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক একটি পেশা বলে জানান কামার প্রদীব কুমার। তারপরও শত কষ্টে তারা পৈত্রিক পেশাকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে যেয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে কামারশালার কামরদের। ঐতিহ্যবাহি কামার শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন উপজেলার সচেতন মহল।