‘শহীদ’ আমাদের নবাব সিরাজ উদ দৌলা
ফখরে আলম

নবাব সিরাজ উদদ্দৌলা কি শহীদের চেয়ে লম্বা ছিলেন? তাঁর কণ্ঠ কি শহীদের মত দরাজ ছিল? তিনি কি ঢোল বাজাতে, গান গাইতে পারতেন? অন্ধকারে বসে এখন অঙ্ক কষি। অন্ধকারে দেখতেও পাই, কাঁধে ব্যাগ, মাথায় নেপালি টুপি দিয়ে শহীদ পার্কের মাঠ, টাউনহল মাঠ ও উদীচী প্রাঙ্গনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। সে খুবই ব্যস্ত। সাংস্কৃতির প্রদীপ জ্বালতে হবে। উদীচীর পতাকা উড়াতে হবে। গণসংগীত গাইতে হবে। দেশ প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করতে হবে। শহীদ এসব নিয়ে খুবই ব্যস্ত। হাতে সময় নেই। চল্লিশ বছর এমন ব্যস্ততায় সময় পার হয়েছে। হঠাৎই ১৭ অক্টোবর সকালে তাঁর সময় হল। সে আমাদের সবাইক কাঁদিয়ে চলে গেল।
দীর্ঘ তিনযুগ আমি শহীদের ব্যস্ততার সঙ্গী ছিলাম। নব্বইয়ের দশকে যশোরে সম্মলিত সাংস্কৃতিক জোট গঠন হওয়ার পর থেকে আমি তাঁর সঙ্গেই আছি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে টাউনহল মাঠে, দড়াটানায় কবিতা পড়েছি। পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস আমাদের দমাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আমরাই জয়ী হয়েছি। পরবর্তীতে শহীদের হাত ধরে আমি উদীচীর উপদেষ্টা হয়েছি। বর্ষবরণে পৌর পার্কে ভোর থেকে প্রায় দুুপুর পর্যন্ত আমরা লাখ বাঙালিকে পূর্ণপ্রাণ করেছি। নতুন প্রভাতে নতুন সূর্যকে স্বাগত জানিয়ে সেই সূর্যের আলো মুঠোবন্দি করে লাখো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি। মঞ্চে উঠে এসেছেন আমাদের নবাব সিরাজ উদ-দৌলা যার ডাক নাম শহীদ। আমি তাকিয়ে দেখেছি টক টকে ফর্সা শালপ্রাংশু শহীদ উচ্চকণ্ঠে বলছে, ‘বাংলার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা।’ বর্ষ বরণের অনুষ্ঠানে শহীদই বেশি তালি পেত। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ উদীচী হত্যাকা-ের পর আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। রক্তাক্ত মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে ঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছি।
শহীদ আমাকে সবসময়ই ভাই বলত। সংগঠন নিয়ে চলার পথে অনেকের সঙ্গে অনেকের বিরোধ হয়। কিন্তু শহীদের সঙ্গে আমার কোনো দিন মতপার্থক্য হয়নি। আমি ২০১২ সালের শুরুতে অসুস্থ হয়ে পড়লে শহীদ আমাকে শান্ত¦না দিয়েছে। জীবনের গান শুনিয়েছে। আমিও শহীদ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর হাত ধরেছি। বলেছি, তোমার পাশে আছি। চিকিৎসা নিয়ে শহীদ বাড়ি ফিরলে আমি তাঁর বাসায় গিয়েছি। এরপর শহীদকে আমি দেখিনি। তবে তাঁর কথা শুনেছি। দুই-চার দিন আগে তাঁর সঙ্গে মোবাইলে আমার শেষ কথা হয়। শহীদ উদীচীর আর এক উপদেষ্টা তন্দ্রা ভট্টাচার্য্যরে বাড়ি থেকে আমাকে ফোন করে। এর আগে শহীদ আমাকে জানিয়েছিল কেমোয় আর কাজ হবে না। ভাবছি বিদেশে যাব। ভারতেও যেতে পারি। আমি তাকে ভারতের টাটা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিই। ১২ অক্টোবর বিবর্তনের নাট্য উৎসবের প্রথম দিন আমি গিয়েছিলাম। শহীদও গিয়েছিল। শহীদের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। আমার স্ত্রী আমাকে বলেছে শহীদ ভাই কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মাথায় টুপি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি এখন সেই দৃশ্যই দেখতে পাচ্ছি। শহীদ সত্যেন সেনের মত উদীচীর আকাশে তারা হয়ে জ্বলছে। আমাদের আশে পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে।

লেখক : কবি সাংবাদিক

শেয়ার