বিশ্বাস-মানবিকতা-সামাজিকতার চর্চা কমছে, বাড়ছে সংহিসতা

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ঘুমন্ত অবস্থায় পাঁচ বছরের সন্তানকে কোল করে বাইরে নিয়ে যান তার বাবা। শিশুটির চাচা ও চাচাত ভাই হত্যা করেন তাকে, ঠিক সে সময় শিশুটিকে জোর করে চেপে ধরে রেখেছিলেন বাবা নিজে। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে শিশু তুহিন হত্যাকাণ্ডে পুলিশের দেওয়া এই তথ্যে শিউরে উঠেছে পুরো দেশের মানুষ। এমন নিষ্ঠুর নির্মমতা মানতে পারছেন না কেউই। এমনকি যারা মামলাটির তদন্ত করছেন, তারাও বিস্মিত-হতভম্ব। ঘটনাটি সহ্য করা মতো নয় মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশিরভাগ মানুষই তাদের প্রতিক্রিয়ায় তুলে ধরেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিকভাবে বিশ্বাস ও মানবিকতার চর্চা কমে গেছে। সামাজিকতার চর্চাও এখন যতটা সামাজিক, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি মানুষকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে সমাজ থেকে। তার ফলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এদিকে, এ ধরনের ঘটনার সুদূরপ্রবাসী প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তারা বলছেন, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন ঘটনায়। ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতাও বাড়িয়ে দিতে পারে এ ধরনের ঘটনা। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, যেকোনো ধরনের সহিংসতায় শিশুরা সহজেই আক্রান্ত হয়। কারণ তারা শারীরিকভাবে অনেক বেশি দুর্বল। আঘাতের জবাবে প্রতিঘাত দেওয়ার শারীরিক সক্ষমতা নেই তাদের। পারস্পরিক শত্রুতায় সুবিধা আদায় করার জন্য শিশুদেরকে আক্রান্ত করার ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেড়ে গেছে। এর কারণ মানুষের ভেতরে বিশ্বাস ও মানবিকতা কমে গেছে।
ফারজানা রহমান বলেন, এ ধরনের অপরাধ সাধারণত রাগের মাথায় করা হয়। কোনো মানুষকে যখন অপছন্দ করা হয় কিংবা তার ভালো থাকাটা সহ্য করা যায় না, তখন তাকে আটকানোর জন্য এক ধরনের নেতিবাচক আবেগ তৈরি হয়, যা থেকে এ ধরনের অপরাধ করে ফেলার মতো সাহস তৈরি হয়। সুনামগঞ্জের ঘটনাটিও এ কারণেই হয়েছে বলা যায়। প্রযুক্তি ও সময়ের প্রবণতায় সমাজ বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়াকেও এ ধরনের ঘটনার অন্যতম কারণ মনে করেন ঢাবি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা পারভীন। তিনি বলেন, পরিবার হলো মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয়স্থল। অথচ সেই পরিবারের চিত্র পাল্টে গেছে। পরিবারের বন্ধন আর আগের মতো নেই। এর পেছনের বড় একটি কারণ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি একদিকে মানুষের কল্যাণের করছে, অন্যদিকে সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ও ডেকে আনছে। এখন মানুষে মানুষে সরাসরি কথা হয় কম, অনলাইনেই বেশি হয়। আগে বেড়াতে বা আড্ডায় গেলে গল্প, আড্ডা হতো। তাতে মানসিক স্বস্তি আসত। এখন বেড়াতে গেলেও দেখা যায়, প্রত্যেকেই হাতে স্মার্টফোন নিয়ে বসে আছে। ফলে মনের আনন্দ আসে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানেরা একই পরিবারে থাকলেও দিনশেষে কারো সাথে কারো ভালোভাবে কথা বলা হয়ে ওঠে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিনোদন মাধ্যমগুলোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন ঢাবি’র এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, চলচ্চিত্র ও নাটকে শিক্ষণীয় বিষয় আজকাল তেমন খুঁজেই পাওয়া যায় না। রুচিহীন বিষয়বস্তু দিয়ে বানানো এসব নাটক ও সিনেমার প্রভাবও পড়ে সমাজে। মানুষের মধ্যে ভালো কিছু চিন্তা করার প্রবণতাও কমে যায়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আত্ম-উপলব্ধি প্রয়োজন উল্লেখ করে অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা বলেন, নিজেকে নিজের বুঝতে হবে, যাকে বলে ‘ঝবষভ জবধষরুধঃরড়হ’। ভালো বই পড়া, চিন্তা করা, অন্যের সঙ্গে গল্প করার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে আবিষ্কার করতে হবে। প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়ে সরাসরি আদান-প্রদানের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সন্তানকেও এভাবে বড় করতে হবে। তা না হলে সমাজে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে। কারণ মানুষের কর্মকা- ও চিন্তার মান তখনই নিচে নেমে যায়, যখন তার সামনে ভালো কিছু উপস্থিত থাকে না।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার ওপর জোর দিলেন ঢাবি এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের প্রভাষক রউফুন নাহার। তিনি মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে হবে। রউফুন নাহার বলেন, সহিংসতা মানুষ দেখে শেখে। শিশুরা সহিংস হয় না। বেড়ে ওঠার সময় সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা দেখে সে এটা নিজের ভেতরে আয়ত্ব করে নেয়। আমাদের সমাজে একটা বিষয় লক্ষণীয়, এখানে বেশিরভাগ মানুষই আবেগ সঞ্চালনা বিষয়টি ভালোভাবে জানে না। সংঘাত নিরসন বলে একটি বিষয় আছে, সে বিষয়টি অনেকেরই জানা নেই। যোগাযোগ দক্ষতা ও সম্পর্কের সৌন্দর্য বিষয়ে কম জানার কারণে সংঘাত নিরসন করার চেয়ে প্রতিশোধে আগ্রহী হয়ে পড়ে মানুষ। ফলে এ ধরনের সহিংসতা ঘটায়। তিনি আরও বলেন, যে বাবা এই কাজটি করেছে, সে হয়তো বাবা-ছেলের সম্পর্কের মধুর দিকটি সম্পর্কেও জানে না। কিভাবে ক্রোধ সামলাবে, সে বিষয়ে জানে না। এজন্য ক্রোধের বশে অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজের সন্তানকেই বলি দিয়ে দিয়েছে। রউফুন নাহার বলেন, আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি খুব অবহেলার চোখে দেখা হয়। এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে মানসিক সেবা বাড়াতে হবে।
এদিকে, শিশু মনোবিজ্ঞানী শারমীন আখতার মনে করছেন, তুহিনকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, এ ধরনের সহিংসতা শিশু মনস্তত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করবে। সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে কাজ করার পক্ষে মত দেন তিনি। শারমীন আখতার বলেন, একটি শিশুর প্রথম নিরাপত্তা হলো তার পরিবার আর সমাজ। আমরা বলি, প্রথম প্রটেকশন হলো শিশুটির মা। এরপরের নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে ভূমিকা থাকবে বাবাসহ কমিউনিটির অন্য সবার। কিন্তু শিশু তুহিন হত্যাকা-ের মতো পৈশাচিক ঘটনা আসলে সব ধরনের সংজ্ঞা আর তত্ত্বকে হার মানায়। পরিবার-সমাজের নৈতিকতা আর বৈশিষ্ট্যের বাইরে গিয়ে একেবারেই অন্যরকম পরিস্থিতি আর অনূভূতি তৈরি করে। এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ে সমাজের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার ওপরে।

এই শিশু মনোবিজ্ঞানী বলেন, বিশেষ করে যে শিশুটি বেড়ে উঠছে, তার মনস্তত্বে এই প্রভাব এতটা দাগ কাটে যে তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সেও হয়ে উঠতে পারে অপরাধী কিংবা অপরাধে সমর্থনকারী। বিশেষ করে এমন একটি নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের পরও কোনো বিচার না হলে বা কেউ সাজা না পেলে সেটা শিশুদের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে থাকে। তারা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তাদের মধ্যে। এই দ্বন্দ্ব থেকে তাদের বের করে নিয়ে না আসতে পারলে তার বিকাশের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হয়। শারমীন আখতার বলেন, এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে বের হতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু পরিবার নয়, এ ক্ষেত্রে কমিউনিটির ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

শেয়ার