বিবর্তনেরর নাট্যোৎসবে দর্শনার অর্ণিবানের জিষ্ণুয়ারা পরিবেশন মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী চিত্র ফুটে উঠলো মঞ্চে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ রাখালিয়া বাঁশিতে সুর তুলে মঞ্চে আসে গ্রামের এক যুবক। বাঁশির সুরের মুর্ছনায় যখন চারপাশ মুখর হয়; ঠিক তখনি একতার, ঢোল, খঞ্জনি, করতালসহ নানান বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির হয় দলবদ্ধ মানুষ। আর তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে দেশাত্মবোধক গান। গানে গানে দৃশ্যপটের বদল ঘটে। নদীর পাড়ে নৌকো ভেড়ায় সুজন মাঝি। পাড়াপাড়ের জন্য গ্রামের মানুষের নৌকোয় উঠতে থাকে। এমন ক্ষণে আকাশ কালো করা মেঘ যেন জমিনে নেমে আসতে থাকে। এরকম দুর্যোগঘন পরিবেশে নৌকোয় করে শুরু হয় দরিয়া পাড়ের লড়াই। শক্ত হাতে বৈঠা নিয়ে উত্তাল ঢেউ মোকবেলা করে এগোতে থাকে মাঝি সুজন। আর ভীত নৌকা যাত্রীদের কেউ আল্লাহর নাম নিয়ে কালেমা পড়তে থাকে। আবার কেউবা দেবী দুর্গার নাম নেয়। এমন দুর্যোগ মাঝে সুজন মাঝির মনে পরে যায় এরকমই এক ঝড়ের দিনের কথা। যেদিন এমন ঝড় ঝঞ্ঝা বিপদের রাতে পাক বাহিনীর আগ্রাসন থেকে একটি গ্রাম রক্ষায় সুজন মাঝির নৌকায় নদী পাড়ি দেয়।
ঝড় থেকে রক্ষা পেয়ে নৌকা যখন পাড়ে ভেড়ে তখন সুজন মাঝি বলে এভাবে নয় মাস যুদ্ধের পর নৌকা আরো একবার তীরে ভিড়ে ছিল। দেশটা স্বাধীন হয়েছিল। এভাবে দৃশ্যপটের বার বার বদল হয়। মুক্তিযোদ্ধা সুজন মাঝির মেয়ে ফুলি খুন হয় দেশদ্রোহী রাজাকারের পরিবারের হাতে। তবে পার পায় না খুনি। মস্তক কেটে খুনিকে হত্যা করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার বিবর্তন যশোরের তৃতীয় আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার অর্ণিবান থিয়েটার নাটক জিষ্ণুয়ারা পরিবেশন করে। নাটকটির নাট্যকার, নির্দেশনা ও মঞ্চপরিকল্পনাকারী আনোয়ার হোসেন।

নাটকের কথা: মহিষের গায়ের মত কালো কুচকুচে রাতে ঘটে নারকীয় তান্ডব। খুন হয় মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ মাঝির বিধবা কন্যা ফুলি। মানুষ সন্দেহের আঙুল তোলে দেশদ্রোহী রাজাকার খন্দকারের পরিবারের দিকে। ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে থানায় মামলা দায়ের করেন ফুলির বাবা। পুলিশ রাজনৈতিক ডামাডোলে মামলাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করে। নিজ ছেলেকে রক্ষার চেষ্টায় ধূর্ত খন্দকার বিষয়টি লোক চক্ষুর আড়ালে নেবার জন্য এবং মানুষের মনোযোগ সরাবার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে উপলক্ষ করে এবং তার পক্ষের চেয়ারম্যানকে পুণরায় নির্বাচনে জেতাবার নিশ্চয়তার জন্যে সরকারের একজন মন্ত্রীকে গ্রামে নিয়ে আসেন। গ্রামে মন্ত্রী আগমনের খবরে মানুষের উৎফুল্লতায় ফুলি হত্যার ঘটনা চাপা পড়ে যায়। স্বার্থের প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের সহঃঅবস্থান একাকার হয়ে যায়। তারপরও কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করেই আপোষহীনভাবে জীবনযাপন করে টিকে থাকে। দেশে যখন রাজাকারের বিচার হচ্ছে তখন একজন রাজাকারের সন্তানের স্বাধীন দেশে একজন মুক্তিযোদ্ধার কন্যার প্রতিনিষ্ঠুরতা তাকে হত্যা করার সকল আলামত দিনের আলোর মত স্বচ্ছ অথচ ক্ষমতা বলয়ের কাছে তারা পরাজিত। এমন পরিস্থিতিতে ফুলির অত্যন্ত স্নেহের যাত্রাশিল্পী এক যুবক জনসমুখে এর শোধ নেবার পরিকল্পনা আটে। খন্দকার বাড়ির চৌহদ্দিতে যাত্রাগানের আয়োজন করা হয় এবং যাত্রার মঞ্চেই ধর্ষক ও হত্যাকারী খন্দকারের বখাটে ছেলের মস্তক শিরোচ্ছেদ করে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়।

নাট্যকার ও নির্দেশকের কথা :
নাটক শুরুতে দলের কথা দিয়েই শরু করি। নাটক জীবনের কথা বলে। নাটক শিল্পের কথা বলে। অতিত-বর্তমান-ভবিষ্যত ত্রিকালকে ধারণ করে এগিয়ে চলে নাটক। বর্তমানে জীবনের এত অসংগতি ও বিচ্যুতিরমধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি সেখানে নাটকের শিল্পী হিসাবে আমাদের বলাটা নাটকের মাধ্যমে হবে সেটিই স্বাভাবিক। অতীত নিয়ে অনেক দূর যাবার প্রয়োজনীয়তা আছে কিন্তু খুবই সাম্প্রতিক অতীত আমাদের সব থেকে গর্বের ‘মুক্তিযুদ্ধ’। মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিলে জাতি হিসাবে কখনও আমরা দাস, কখনও প্রজা, আবার এক সময় আমরা নিজদেশে পরবাসী হয়ে উঠলাম। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সেই শৃঙ্খল ভেঙ্গে বের করে এনেছে। আমরা মানুষ হয়েছি, নাগরিক হয়েছি।

শেয়ার