বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক কাজ করছে প্রশাসন
৯ মাসে বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তি পেয়েছে যশোরের ৫৩ স্কুলছাত্রী

জাহিদ হাসান
যশোরের মণিরামপুরে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সালমা আক্তার (ছদ্দনাম)। মণিরামপুর উপজেলার কোদলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। (২৬ সেপ্টেম্বর) একদিন হঠাৎ করে একই উপজেলার হরিহরনগর ইউপির গোয়ালবাড়ি গ্রামের সোহরাব হোসেনের বিদেশ ফেরত ছেলে আব্দুল আলীমের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু মেয়েটি ওই সময় স্কুলের ৮ম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা দিচ্ছিল। সেইদিন সন্ধ্যায় বিয়ের প্রস্তুতিও চলছিলো। স্থানীয়রা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেয়। কথাগুলো সমাজের কথার এই প্রতিবেদককে বলছিলেন সদ্য বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তি পাওয়া ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রী। শুধু মণিরামপুরের সালমা আক্তার না চলতি বছরের গত ৯ মাসে তার মতো বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তি পেয়েছে যশোর জেলার ৫৩ স্কুলছাত্রী।
জেলা মহিলাবিষয়ক কার্যালয় সূত্র মতে, যশোর জেলার ৮ উপজেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৩টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪টি, মার্চ মাসে ১১টি, মে মাসে ১০টি, জুন মাসে ৬টি, জুলাই মাসে ৭টি, আগস্ট মাসে ৫টি, সেপ্টেম্বর মাসে ৯টিসহ মোট ৫৩ স্কুলছাত্রীকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করেছে যশোর জেলা প্রশাসন। এসব ছাত্রীরা বেশির ভাগ ৭ম থেকে ৯ম শ্রেণির বলে জানিয়েছেন মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তারা।
জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সকিনা খাতুন বলেন, সারা বিশ্বে যখন বাল্যবিবাহ কমছে তখন এদেশে দিনকে দিন বাল্যবিবাহ বাড়ছে। যার প্রধান কারণ হচ্ছে পারিবারিক অসচেতনতা। এই লক্ষ্যে সরকার বাল্যবিবাহ জিরোটলারেন্স নীতি নিয়েছে। জেলায় কোথাও বাল্যবিবাহ হলে ৯৯৯ বা ১০৯ নম্বরে ফোন দিলে বাল্যবিবাহ বন্ধে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। তাছাড়া যশোরে মহিলা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় স্কুল-মাদ্রাসা ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক কাজ করছে।
বাল্যবিবাহ দূরীকরণে নানা উদ্যোগ এবং সমস্যা নিয়ে কথা হয় মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা বাল্য বিবাহ দূর করতে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইমাম, কাজী, পুরোহিতদের প্রশিক্ষণ, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক, সাধারণ মানুষকে নিয়ে বৈঠক, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধি কনসার্টসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে প্রশাসন। আর শেষ পর্যায়ে বাল্য বিবাহ দিলে আইনের মাধ্যমে শাস্তি পেতে হবে বলে সতর্ক করেছি। তিনি বলেন, আমি যুব সংগঠনের শিক্ষার্থীদের কাছে আমার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার দিয়ে রেখেছি। তারা যেকোনো সময় আমাকে ফোন দিতে পারবে। আর আমি ফোন পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই। যার কারণে মণিরামপুর উপজেলায় বাল্যবিবাহ বেশি, তা বন্ধে উপজেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
যশোর জেলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রফিকুল হাসান বলেন, যশোরে বাল্যবিবাহ হয় বেশির ভাগ মফস্বলে বা গ্রামে। গোপনে বিয়ে দেয়া, আবার ভুয়া জন্ম-নিবন্ধন সার্টিফিকেট তৈরি করে বিয়ে দেয়া হয়। অনেক সময় দুজন প্রেম করে নিজেরা বিয়ে করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে। এগুলো বন্ধ করা অনেকক্ষেত্রে কষ্টকর।
তিনি আরো বলেন, অনেক সময় দেখা যায় বিয়ের আয়োজন করার পর প্রশাসন বিয়ে বন্ধ করে দিতে পারে বা দেয়, কিন্তু সেটা ওই মেয়ের জন্য একটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে এটা শুনলে পরে বিয়ে দিতে সমস্যা হবে, মেয়ের মানসিক চাপ বাড়ে, আবার লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিয়ের আয়োজন করার পর বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটার নেগেটিভ প্রভাব পড়ে পরিবার এবং সমাজের উপর। তাই প্রশাসন বাল্যবিয়ে বন্ধ করার চেয়ে বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করছে।