তিন শিক্ষাবোর্ডের সনদ সংশোধন হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের আদলে

সরদার সিদ্দিক, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) ॥ আগামীতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, টেকনিক্যাল-কারিগরি শিক্ষাবোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষা সনদ সংশোধন হবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় পরিচয়পত্রের আদলে। সম্প্রতি তিন শিক্ষা বোর্ডের উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবন্ধন অনুবিভাগের সঙ্গে এক নীতি-নির্ধারণী সভায় কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবিধানিক সংস্থা ইসির এই সিদ্ধান্ত অনুসরণে বোর্ডের সংশ্লিস্টরা সভায় একমত পোষণ করেন। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে আগামীতে জাতীয় পরিচয়পত্রধারী নাগরিকরা বিশেষ করে জন্মতারিখ, পুরো নাম এবং পিতা-মাতার নাম সংশোধনে বোর্ডের সনদ সংশোধনে স্ব স্ব বোর্ডের কাছে আবেদন করতে হবে। খবর ইসির সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম-সচিব এবং এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন) আবদুল বাতেন বলেন, দেশের নাগরিকদের মধ্যে যারা জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বলছেন- বিদ্যমান এনআইডিতে যে জন্মতারিখ ও নাম রয়েছে সেটি সঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত নাম এক্স ও ওয়াইজেদ। অথচ ওই সব ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে চাকরিতে কর্মরত আছেন, অনেকের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ও টেকনিক্যাল ও কারিগরী অথবা উন্মুক্ত থেকে সনদ এনে ওই আদলে এনআইডি সংশোধনে আবেদন জানাচ্ছেন। সংশ্লিস্ট কর্মকর্তা বলেন, ইসিতে সংশোধনের জন্য আবেদন করা ব্যক্তিদের কাগজপত্র বা দাললিক প্রমাণসমুহ তদন্ত করে দেখা গেছে, এনআইডি পাওয়ার পর ভিন্ন অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে নতুন করে ওইসব শিক্ষা বোর্ড থেকে সনদ নিয়ে তার আদলে তারা সংশোধন করতে চাইছে। তাই কমিশন থেকে এনিয়ে তিক্ত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিস্ট বোর্ডগুলোকে নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত সনদ সংশোধন হবে আগামীতে ওই জাতীয় পরিচয়পত্রের আদলে, যোগ করেন ইসির এই চৌকস কর্মকর্তা। তবে, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ইসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সঠিক। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। এনআইডিকে ভিত্তি ধরলে শিক্ষাজীবনের সনদ অনেকটা ফিকে হয়ে যায়। এটা বাণিজ্যের একটা অংশও হয়ে যেতে পারে। আইডি নাগরিক পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও শিক্ষা সনদ মানুষের সামাজিক মর্যাদার অংশ। এমনকি চাকরিসহ সর্বক্ষেত্রে শিক্ষা সনদ-প্রধান পরিচয়ক হিসেবে ব্যবহার হয়; এটা মানুষের আতœগৌরবের বিষয়, যোগ করেন ওই কর্মকর্তা। এনআইডির সংশ্লিস্টরা জানান, ১/১১ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ছবিযুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্র কার্যক্রম হাতে নেয় নির্বাচন কমিশন। এরআগে একজন ব্যক্তি ম্যানুয়ালি পদ্ধতিতে একাধিক স্থানে ভোটার হতেন বলে অভিযোগ ছিল। পরে ভোটার হওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা কার্যকর শুরু হয় ২০০৭ সালে, ওই তালিকায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বর্তমানে সাড়ে ১০ কোটির মতো ভোটার রয়েছে। বেশির ভাগ ভোটারের নাম-জন্মতারিখ ভুল বিদ্যমান জাতীয় পরিচয়পত্রে। সংশ্লিস্ট ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত এনআইডি সংশোধনে আবেদন নিয়ে ইসিতে হাজির হচ্ছে। গত কয়েকবছরে এ সংখ্যা মোট ভোটারের ৪০ শতাংশের মতো। এনিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি ইসি। সম্প্রতি একটি ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে ইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, একজন ব্যক্তি সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে কর্মরত। তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ডির্ভোস হওয়ার পর দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেন। সম্প্রতি পেনশন সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে ওই সেনাসদস্য তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ও পিতার নাম সংশোধন করে প্রথম স্ত্রীর নাম পরিচয় গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। গত ২০০৭ সাল থেকে নকল পরিচয় ধারণ করার জন্য ইসিতে ঘোরাফেরা করছেন ওই সেনা সদস্যের স্ত্রী। কিন্তু ইসি এই অনৈতিক কাজে সহযোগিতা না করায় এনিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিভিন্ন সময় তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও জানা গেছে। সম্প্রতি ওই নারীর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের এনআইডি উইংয়ে সাক্ষাত হয়। তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। শুধু ওই নারী নয়, অনেকেই এর পেছনে ছুটছেন। আবার অনেকে এনআইডি ২০০৭ সালে গ্রহণ করার পর চাকরি কিংবা বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বয়স কমাতে (যাদের সুযোগ রয়েছে) মাদ্রাসা, কারিগরি ও উন্মুক্তে ভর্তি হয়ে সনদ নিচ্ছেন। এর আদলে সংশোধন করতে চাইছে বিদ্যমান এনআইডি। এ বিষয়ে উপায়ন্তর না পেয়ে কমিশন ওই শিক্ষাবোর্ডের উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্প্রতি সভা করে। সভায় জাতীয় পরিচয়ে থাকা বড় ধরণের যেমন নামের পুরো অংশ কিংবা আংশিক যোগ করা অথবা জন্মতারিখ পুরো সংশোধন করা। এ ধরণের অহরহ আবেদন হচ্ছে। তাই ওই বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে আগামীতে জাতীয় পরিচয়পত্র নয়, এর আদলে শিক্ষা সনদ সংশোধনের বিষয়ে একমত হয়। তবে, জ¥তারিখ ও নামের করণীয় ভুল সংশোধন করা যাবে দাললিক প্রমাণ সাপেক্ষে ইসির এনআইডি উইং থেকে জানান ইসির সংশ্লিস্টরা।

শেয়ার