আলোচিত সম্রাট কারাগারে

যুবলীগ থেকে বহিষ্কার 
ছয় মাসের কারাদণ্ড

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে আটক করা হয়েছে। রোববার দিনভর অভিযান শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আটকের পর অভিযানে সম্রাটের কাকরাইল অফিস থেকে ক্যাঙ্গারুর দু’টি চামড়াসহ একটি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দুটি বৈদ্যুতিক টর্চার মেশিন, ১৯ বোতল বিদেশি মদ ও ১ হাজার ১৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের ছয় মাসের কারাদ-ও দিয়েছে। পাশাপাশি তাদেরকে যুবলীগ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ক্যাসিনো চালানোর তথ্য প্রকাশের পর আত্মগোপনে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সহ সভাপতি এনামুল হক আরমানকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে ছয় মাস করে কারাদ- দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এর মধ্যে সম্রাটের সাজা হয়েছে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইনে, তার কাকরাইলের অফিসে দুটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া পাওয়ার কারণে।
আর কুমিল্লায় গ্রেপ্তারের সময় আরমান ‘মদ্যপ’ থাকায় তাকে সেখানেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে র‌্যাবের নির্বাহী হাকিম সারওয়ার আলম জানিয়েছেন।
ক্যাসিনোকা-ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সম্রাট ও এনামুল হক আরমানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু রোববার দুপুরে এ তথ্য জানান।
বাবলু বলেন, “আমাদের চেয়ারম্যানের ঘোষণা অনুযায়ী এই অভিযানে যারাই আটক হবে, তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার করা হবে। সে হিসেবে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।”

এর আগে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাট ও আরমানকে আটক করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে সম্রাটকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। র‌্যাব সদর দফতরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাকরাইলে সম্রাটের অফিসে অভিযান চালায় র‌্যাব।
অভিযানে সম্রাটের কাকরাইল অফিস থেকে ক্যাঙ্গারুর দু’টি চামড়াসহ একটি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দুটি বৈদ্যুতিক টর্চার মেশিন, ১৯ বোতল বিদেশি মদ ও ১ হাজার ১৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব। তার কার্যালয় থেকে ক্যাঙ্গারুর চামড়া উদ্ধারের ঘটনায় ছয় মাসের কারাদ- দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে সম্রাটকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে।’
কাকরাইল অফিসে অভিযান শেষে সম্রাটকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান।
এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় র‌্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো চলার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আলোচনায় ছিলেন তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, শনিবার গভীর রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জশ্রীপুর গ্রাম থেকে সম্রাট ও আরমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় র‌্যাবের অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো চলার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে আলোচনায় ছিল যুবলীগ নেতা সম্রাটের নাম।
সেদিন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর সদলবলে কাকরাইলে নিজের কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে রাতভর সেখানে ছিলেন সম্রাট। কিন্তু এরপর তিনি নিরুদ্দেশ হন।
র‌্যাবের অভিযানের সময় মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রের ভেতরে সম্রাটের বিশাল ছবি দেখা যায়। ওই ক্লাবের ক্যাসিনো তিনিই চালাতেন এবং মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় অন্য ক্যাসিনোগুলো থেকেও প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে চাঁদা তার কাছে যেত বলে গণমাধ্যমে খবর আসে।
সম্রাটের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা আরমানও দীর্ঘদিন ধরে ক্যাসিনোর কারবারে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি তিনি ঢাকাই সিনেমাতেও টাকা খাটাচ্ছিলেন।
আরমানের প্রোডাকশন হাউস ‘দেশ বাংলা মাল্টিমিডিয়া’র ব্যানারে প্রথম সিনেমাটি মুক্তি পায় গত কোরবানির ঈদে। ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ নামের ওই সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাকিব খান ও বুবলী।
চৌদ্দগ্রাম থানার আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক হেলাল জানান, কুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের যে বাড়ি থেকে সম্রাট ও আরমানকে ধরা হয়েছে, সেটি স্টার লাইন পরিবহনের মালিক আলাউদ্দীনের ভগ্নিপতি মনিরের বাড়ি। শনিবার সন্ধ্যা থেকেই বাড়িটি ঘিরে রেখেছিল র‌্যাব।
তবে মনির কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি ইউপি চেয়ারম্যান হেলাল।
সহযোগী সংগঠন যুবলীগের নেতাদের চাঁদাবাজি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অসন্তোষ প্রকাশ পাওয়ার পর জুয়ার আখড়া বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অভিযান শুরু হয়।
মতিঝিলের ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুল ক্লাবে ক্যাসিনো চালানোর ঘটনায় ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। পরদিন কলাবাগান ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার হন কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে। দুদিন পর নিকেতন থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ঠিকাদার জি এম শামীমকে, তিনিও যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন।
‘অপকর্মকারীদের’ বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব অত্যন্ত কঠোর-এমন বার্তা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে আসার পর আত্মগোপনে যান সম্রাটসহ যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা।
তাদের মধ্যে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান, মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বকুল এবং ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মতিঝিলের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদের নামও এসেছে।
সম্রাট নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই তাকে নিয়ে বিভিন্ন রকম খবর আসছিল সংবাদ মাধ্যমে। কিন্তু যুবলীগের অফিস কিংবা বাসা- কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
এরই মধ্যে সম্রাটের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ।
ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের এই নেতাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করেছে বলে এর আগেও বিভিন্ন সমেয়ে শোনা গেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করেনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলে আসছিলেন, ‘সম্রাট হোক আর যেই হোক’, অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

শেয়ার