কবিতার জন্মঘর
আ র শি গা ই ন

ভাবনার অভিব্যক্তিকে শিল্পিত রূপে প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো কবিতা। যেখানে মনের আলো আঁধারি ক্যানভাসে নান্দনিকতার আঁচড়ে জীবন কথনের ছবি আঁকা হয়। আর সে ছবিতে থাকে আস্বাদনের ব্যঞ্জনায় চির নতুনের এক অনিবার্য সন্নিবেশ। যা বুঝবার কোনো চূড়ান্ত পর্যায় থাকে না। বিজ্ঞান, অঙ্ক বা অন্য কোনো বিষয় একবার বুঝে গেলে তার মধ্যে খুব নতুন ব্যঞ্জনা থাকে না। কিন্তু কবিতা? কবিতা সেতো অধরা নক্ষত্ররাজির মতোন বিস্তৃত। যার অন্তর ছেদন অসম্ভব; অনর্ভেদও দুঃসাধ্য। বোদ্ধা পাঠক যতোবার কবিতা পড়েন বা গুণি আবৃত্তি শিল্পীর কণ্ঠে যতোবারই শোনেন ততোবারই তার বোধের সীমানা প্রসারিত হতে থাকে।
কবিতা পড়লে বা আবৃত্তি শুনলে মনের মধ্যে যে অনুভূতির নীরব বা সরব উপস্থিতি টের পাওয়া যায় তাই হলো ওই কবিতার অর্থ। একটা কবিতার অর্থ একেকজনের কাছে একেক রকম ভাবে ধরা দেয়। মূলত চেতনার অভিব্যক্তিকে নাড়া দিয়ে মনের ঘুমন্ত সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে কবিতা। দেহ ও মন নিয়ে যেমন পুরো একটি মানুষ, তেমনি কাব্যভাষাও কাব্য ভাবনা নিয়ে গোটা একটা কবিতা।
কবিতা তৈরি হয় ভাব, ভাষা, ছন্দ অলঙ্কারের পারস্পারিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে; আর কবির তৃতীয় নেত্রের প্রসাদে ব্যঞ্জনায় ও ইঙ্গিতে ধীরে ধীরে কাব্যশরীরের সঞ্চারিত হয় মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ যা শুধু কবির একার নয়। লক্ষজনের প্রাণেও স্বোত্তরণের প্রেরণা জোগায়। কিন্তু কবিতার সেই মৃতুঞ্জয়ী প্রাণ, প্রতিষ্ঠায় কবির যে ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয় তা নিতান্তই এক আধ্যাত্মিক পথে হেঁটে পৌঁছাতে হয় সেই মহাশক্তির মুখোমুখি। তারপর যন্ত্রণা আর নিজের ভেতর উথালপাথাল এক ভাবনা জ্বালাতে থাকে।
একজন কবি যখন কবিতা রচনা করেন তার অনেক আগে থেকে তাঁর ওপর ভর করে শৈল্পিক এক ভাব। আর সে ভাব কোথা থেকে আসে, কী ভাবে আসে সে প্রশ্নের মীমাংসা হয়তো কোনো দিনই হবে না। তবে একথা সত্য কবি কখনো ইচ্ছে করলেই কবিতা লিখতে পারেন না। তাকে অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন রাতের পর রাত। সাধনা করতে হয় অনিন্দ্য এক সুন্দরের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগীতে তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। তিনি লিখলেন, ‘বসে আছি হে কবে শুনিব তোমার বাণী/তুমি যাহা বলিবে তাই বলিব আমি কিছুই না জানি।’ ভাব না আসা পর্যন্ত কবির কিছুই করার থাকে না। ইচ্ছে করলেই লেখা যেতে পারে, তবে তা কতোটা কবিতা হয়ে ওঠলো, সে-বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অতপর এক শুভক্ষণে যখন কুয়াশাছন্ন ধোঁয়াশার মধ্যদিয়ে অলৌকিক ভাবের রশ্মি যখন কবির মনমন্দিরে প্রবেশ করে, তখনি শুরু হয় কবির অন্তর্সত্ত্বার অমীমাংসিত ব্যবচ্ছেদ। তখন ভাবকে বাণীতে রূপান্তর করতে কবির ভেতরে জ¦লুনী তৈরি হয়, কবি পাগল হয়ে ওঠেন; সৃষ্টির তাড়নায় আত্মহারা হন, নিজেকে ভাব আর বাণীর সেতুতে বাঁধতে মরিয়া হন। তখন পৃথিবীর আর কোনো ভাবনা স্পর্শ করতে পারে না কবিকে। পুড়তে থাকেন অলৌকিক এক সৌন্দর্যের আগুনে। আর সে যন্ত্রণা ঘনীভূত হতে থাকে বোঝা না-বোঝার আলো-আঁধারি ক্যানভাসে। নিজেকে হারিয়ে কবিমন মুহূর্তে ঈশ্বর হয়ে ভাঙাগড়ার খেলায় মেতে ওঠেন। বারবার নিজেকে ভেঙে গড়তে থাকেন আপন মনে। কখনো কখনো নিজের প্রতি অসন্তুষ্টির লেহনে শেষ হয়ে যান নিজের মাঝেই। কী এক সুন্দর যেন তিনি খুঁজতে থাকেন, অথচ ধরতে পারেন না। এই না ধরতে পারার যন্ত্রণা তাকে সমাজ থেকে ছিটকে ফেলে। সাধারণ দৃষ্টিতে তখন তিনি হয়তো পাগল, হয়তো বিবাগী। সমাজ সংসার থেকে তাই কবিকে কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে দেখা গেছে। অথচ সে মহাবিশে^র, সে সৌরম-লেরও বাইরে আরেকটি পরিম-লকে তৈরি করেন কল্পনার জালে। তারপর এক সময় ধরা দেয় সেই কাক্সিক্ষত সুন্দর। ভাব রূপ পায় বাণীতে। রচিত হয় কবিতা। কবি মুক্তি পান সৃষ্টির যন্ত্রণা থেকে। হেসে ওঠে তার নতুন পৃথিবী। মনের নান্দনিক নির্যাস আর ঐশ্বরিক ভাবের মিলনক্ষেত্রে শিল্পের যে সুন্দর ধরা দেয়, তার অনিবার্য গাঁথুনি কবিকে মুক্তি দেয় সব অন্তর ব্যবচ্ছেদের অমীমাংশিত যাতনা থেকে। আর তখন সমুদ্রমন্থনের মতো নিজেকে আবিষ্কার করেন মহাজাগতিক এক পবিত্রতায়। বহুযুগ পর কবির সেই দৃষ্টির কাছে পৌঁছতে দেখা যায় বিজ্ঞানকেও। যার বহুপ্রমাণ বহন করে চলেছে কবিতার পৃথিবী, কবিপৃথিবী।
এখানেই শেষ নয়। কবির বাণীরূপ কবিতায় কখনো কখনো চলতে থাকে অলঙ্করণের কাজ। নিজের শব্দভান্ডার থেকে শব্দ সাজাতে চলে ভাঙাগড়ার আরেক খেলা। যতোক্ষণ না অনিবার্য শব্দের সন্নিবেশে সব চাইতে সুন্দরতম উপস্থাপন ধরা না দিচ্ছে ততোক্ষণ কবি নিজের প্রতি কোনোভাবেই তুষ্ট নন। এক্ষেত্রে একটা কবিতার জন্য কবিকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শ্রম দিতে হয়। সে শ্রম নির্মোহ এবং একান্তই শিল্পর জন্য দিয়ে থাকেন। তারপর আবার একদিন কবি নিজেকে আবিষ্কার করেন তার পূর্ণ সৃষ্টির মধ্যে। তারপর কবি আবার মিশে যান সামাজিক মিছিলে। তখন তিনি নিজের লেখা কবিতা পড়ে অবিভূত হনÑ কী তার সৃষ্টি। যতোবার নিজের কবিতা পড়েন ততোবারই আবিষ্কার করেন নতুন নতুন বিষয়। প্রসারিত হতে থাকে ভাবনার মহাজগৎ। এভাবেই সাধারণ মানুষ থেকে একজন কবি আলাদা।
আমার মনে হয়, কবি আর নবীÑ দুজনের কাছেই যেনো ঐশ্বরিক শিল্প আসে। নবীর কাছে আসে বাণী। যা হুবহু লিপিবদ্ধ হয়। তার কোনো অংশ বা অংশবিশেষ কোনোভাবেই পরিবর্তন পরিমার্জন বা সংশোধনযোগ্য নয়। আর কবির ওপর ভর করে ভাব। আর সে ভাবকে বাণীতে রূপান্তরের দায়িত্ব পড়ে কবির ওপরেই। ভাবকে বাণীতে রূপান্তর এবং তাতে অলঙ্করণের নেশা যখন কবিকে গ্রাস করে তখন তিনি যেনো ¯্রষ্টা হয়ে ওঠেন, ঈশ্বর হয়ে ওঠেন তার কবিতার। ভাবরথের সারথী হয়ে কবি চষে বেড়ান বিশ্বব্রহ্মান্ড। চাষ করেন অনাগত শিল্পের।

লেখক: কবি
ইমেইল : arshigain@gmail.com