যশোরে যৌনকর্মীদের টাকায় পকেট ভরছে পুলিশের

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যশোরে জীবনের কাছে হেরে জীবিকার জন্য সর্বস্ব হারানো বারবনিতাদের সম্ভ্রমের মূল্য হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। প্রতিমাসে নির্ধারিত দিনে তাদের শুধু পুলিশকেই দিতে হচ্ছে ২ লাখ টাকা। এছাড়া স্থানীয় দালাল ও প্রভাবশালীরাও লুট করছে তাদের শ্রমের অর্থ। বৈধভাবে ব্যবসা করলেও সামাজিক মর্যাদাহীনতার কারণে তাদের অভিযোগও আমলে নিচ্ছে না কেউ। তাই শহরের বড় বাজারের মাড়–য়া মন্দির সংলগ্ন পতিতা পল্লীর বাসিন্দারা নিদারুন সংকট দিনাতিপাত করছেন।
জানা গেছে, যশোর শহরের বড় বাজারের মাড়–য়া মন্দির সংলগ্ন পতিতা পল্লীতে তিনটি বাড়ি রয়েছে। এক নম্বর বাড়িতে প্রায় ৩০ জন, দুই নম্বর গলিতে ৩৫ জন ও তিন নম্বর গলিতে ৪০ জনের মত যৌনকর্মী রয়েছে। এ সকল গলিতে দূর-দুরান্ত থেকে আসা খরিদ্দাররা যৌনকর্মীদের শ্রমের মূল্য তাদের সাথেই ঠিক করে নেন। কিন্তু গলি থেকে বের হওয়ার সময় খরিদ্দারদের মাথাপ্রতি ২০ টাকা করে পুলিশি ‘ভ্যাট’ দিতে হয়। একজন ব্যক্তি গলির মাথায় বসে থেকে এ টাকাগুলো আদায় করেন। আর এই টাকা না দিলে অনেককে আবার মারপিটের শিকার হতে হয়। ফলে এক নম্বর গলি থেকে প্রতিমাসে পুলিশকে দিতে হয় ৪০ হাজার টাকা। আর দুই নম্বর গলি থেকে ৩০ হাজার এবং তিন নম্বর থেকে দেয়া হয় ৩৫ হাজার টাকা।
শুধু তাই নয় কোনো যৌনকর্মীর কাছে খরিদ্দাররা রাতযাপন করলে পুলিশ বাবদ দিতে হয় জনপ্রতি ৬শ’ টাকা। কেউ ঘর বদল করলে পুলিশকে দিতে হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। নতুন মেয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে পুলিশকে দিতে হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
আর কোনো খরিদ্দারের সাথে দুর্ব্যবহার বা টাকা বেশি নিলে সদর পুলিশ ফাঁড়িতে সালিশ বসানো হয়। ওই সালিশেও যৌনকর্মীদের কাছ থেকে জরিমানা বাবদ আদায় করা হয় ৫০ হাজার টাকা করে।
এর মধ্যে এক নম্বর গলিতে বাবু নামে একজন মদ ব্যবসায়ী দেখাশুনা ও টাকা আদায় করেন। দুই নম্বর গলিতে আরেক মদ ব্যবসায়ী হাসান এবং তিন নম্বর গলিতে অনিমা নামে একজন সর্দারনী এ সকল টাকা আদায় করে থাকেন। ফলে জীবনের কাছে হেরে জীবিকার জন্য সর্বস্ব হারানো বারবনিতাদের সম্ভ্রমের মূল্য দিনে দিনে হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। প্রতিমাসে নির্ধারিত দিনে তাদের শুধু পুলিশকেই দিতে হচ্ছে ২ লাখ টাকা। এছাড়া স্থানীয় দালাল ও প্রভাবশালীরাও লুট করছে তাদের সম্ভ্রমের অর্থ। জীবন রক্ষায় জীবিকার জন্য অনেক অসহায় কিশোরী ও নারীরা এপথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক মর্যাদাহীনতার কারণে তাদের অভিযোগও আমলে নেয় না কেউ। তাই শহরের বড় বাজারের মাড়–য়া মন্দির সংলগ্ন পতিতা পল্লীর বাসিন্দারা নিদারুন সংকটে দিনাতিপাত করছেন।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন কারণে স্বামী সন্তান ছেলে বা সমাজচ্যুত হয়ে এপথ বেছে নেন। যুগযুগ ধরে অনেকে এখানে থেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। তাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন ধরনের হস্ত শিল্পের কাজ শিখেছেন। তারা এখান থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে বাঁচতে চান।
এক নারী জানিয়েছেন, এক নম্বর গলিতে আগে নাইটগার্ড কাশেম গাজী নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি মারা যাওয়ার পরে তার ভাই দেখাশুনা করতেন। সেই গলিতে বর্তমানে দেখাশুনা করছেন বাবু নামের এক মদ ব্যবসায়ী। ভিতরে কেউ ঝগড়া করলেও বিষয়টি ফাঁড়িতে জানিয়ে দেয়া হয়। আর ফাঁড়িতে ডেকে নিয়ে গালিগালাজসহ মোটা অংকের টাকা দিয়ে রক্ষা পেতে হয়। আর কারো কাছে টাকা না থাকলে গলি দেখাশুনা করা ব্যক্তি ধার দিয়ে পরে আদায় করেন।
এ ব্যাপারে সদর ফাঁড়ি পুলিশের পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন টাকা লেনদেনের কথা অস্বীকার করেছেন।

শেয়ার