স্ত্রীর চিকিৎসা খরচ জোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ একা আয়ের পরে স্ত্রী সালমার প্রতি সপ্তাহে রক্ত দেয়া কষ্ট সাধ্য হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। সালমার হৃদরোগসহ আরও রোগ ছিল। প্রতি সপ্তাতে রক্ত দেয়া এবং ছোট বাচ্চার জন্য দুইটি করে দুধ ক্রয় করা স্বামী ফারুক হোসেনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই পাতলা পায়খানা ও বমি হলে গত বছরের ৮ অক্টোবর সকালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পথে তাকে গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এমনই কথা জানিয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন নিহত সালমার স্বামী ফারুক হোসেন। সোমবার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গৌতম মল্লিক জবানবন্দি শেষে ফারুক হোসেনকে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দিয়েছেন। আসামি ফারুক হোসেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ঘোজাডাঙ্গা (দক্ষিণ শ্রীপুর) গ্রামের নূর ইসলা ঢালির ছেলে। তিনি যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকার ইকরামুল ইসলাম ইকু চৌধুরীর ভাড়াটিয়া।
ফারুক হোসেন পুলিশ ও আদালতকে বলেছেন, তার প্রথম স্ত্রী একটি মেয়ে সন্তান ফেলে অন্যের হাত ধরে পালিয়ে যায়। এরপর বছর চারেক আগে তিনি সালমা খাতুনকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সালমা হৃদরোগ আক্রান্ত ছিল এবং তার ¯্রাব ভাঙ্গতো। সে কারণে প্রতি সপ্তাহে সালমাকে রক্ত দেয়া লাগতো। তাছাড়া ছোট বাচ্চাটির জন্য সপ্তাহে দুইটি করে দুধ ক্রয় করতে হয়। তিনি (ফারুক হোসেন) যে আয় করেন তাতে সালমাকে রক্ত দেয়া এবং বাচ্চার দুধ কেনা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ফলে সালমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। এক পর্যায়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর রাতে সালমার পাতলা পায়খানা ও বমি হয়। রাতে স্থানীয় একজন কোয়াক ডাক্তার দেখানো হয়। কিছুটা সুস্থ্য হলে পরদিন ৮ অক্টোবর সকালে আবারো বমি করে। এসময় ছোট ভাইয়ের শ্যালক তুহিনকে সাথে নিয়ে সালমাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রিক্সায় করে নিয়ে রওনা করি। কিন্তু রিক্সায় থাকতেই সালমার গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় আমি (ফারুক হোসেন) হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাই।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, ফারুক হোসেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকার ইকরামুল ইসলাম ইকু চৌধুরীর পুকুরপাড়ে একটি বাড়ি তৈরি করে বসবাস করতেন। ১০ বছরের একটি মেয়েকে ফেলে তার প্রথম স্ত্রী একজন মটর মিস্ত্রির হাত ধরে অজনার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। এর ৪ বছর পরে তিনি সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার নোড়ারচক গ্রামের মৃত আব্দুল বারীর মেয়ে সালমা খাতুনকে (২২) দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বিয়ের পর ফারুক হোসেন পুণরায় প্রথম স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন। এ জন্য দ্বিতীয় স্ত্রী সালমা খাতুনকে নির্যাতন করতে থাকেন। গত বছরের ৭ অক্টোবর রাত ১১ টার দিকে সালমা খাতুনের পায়খানা ও বমি হতে থাকে। ফলে তাকে রাতে কোয়াক ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। পরদিন সকালে তার বমি হওয়া ও বুকে ব্যাথা শুরু হলে দ্রুত যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ সময় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সালমার মৃত্যু রহস্যজনক হলে অপমৃত্যু মামলা হলেও লাশের ময়নাতদন্ত করানো হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফারুক হোসেনকে দায়ী করে নিহতের স্বজনরা। প্রথম স্ত্রীকে ফের ফিরিয়ে আনার জন্য সালমা খাতুনকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ করেন তার ভাই জাকির হোসেন। ফলে তিনি বাদী হয়ে ফারুক হোসেনসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে গত ৩০ জুলাই কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। এমামলার অপর দুই আসামি হলেন, ফারুক হোসেনের মা ফজিলা বেগম ও ছোটভাইয়ের শ্যালক তুহিন গাজী। মামলা দায়েরের পর পুলিশ ফজিলা বেগম ও তুহিন গাজীকে আটক করে।

শেয়ার