পানি আইনে নদের দুই পাড়ের সব ভবন অবৈধ!
উচ্ছেদ ঠেকাতে তদবিরে ভৈরবের দখলদাররা

দেবু মল্লিক ও সালমান হাসান
ভৈরব পাড়ের একাংশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে যশোর জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্তের পর তা বন্ধের মিশনে নেমেছে দখলদাররা। তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ঢাকায় গেছেন। যোগাযোগের চেষ্টা করছেন জেলা কর্মকর্তাদের সাথেও।
তবে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আগ্রহে ভৈরব নদ খননে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভৈরবের ‘জীবন ফেরাতে’ আইন অনুযায়ী যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। তাই কোন প্রভাবশালীর প্রভাবে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের সুযোগ নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ঈদের আগে শুরু হওয়া খনন কাজ ফের শুরু হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঠিকাদারের সাথে তাদের কথা হয়েছে। শ্রমিকরা ঈদের ছুটিতে থাকায় কাজ বন্ধ ছিলো। দুই এক দিনের মধ্যেই শুরু হবে কাজ।
সূত্র বলছে, উচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইন অমান্য করে গড়ে ওঠা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন ভাঙা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় যশোরে ভৈরব নদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গত ১৮ আগস্ট যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক সভা থেকে পানি আইনের ‘প্লাবন ভূমি’র নিয়ম প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। জেলা উন্নয়ন কমিটির সমন্বয় সভার ওই সিদ্ধান্তের পর দৌঁড়ঝাপ শুরু করে অবৈধ দখলদাররা। এসব অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভবন রক্ষায় কী করা যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে। পরে তারা মিশন বাস্তবায়নে ঢাকায় যাচ্ছেন। যশোর জেলা প্রশাসনকেও পানি আইন বাস্তবায়ন না করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের এই অবৈধ উদ্দেশ্য সফল হবে না বলে জানিয়েছেন যশোর প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, যশোর শহর অংশে অনেক অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে কাঠেরপুল থেকে নীলগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত সিএস ম্যাপ অনুযায়ী ৬২টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলো দ্রুতই উচ্ছেদ শুরু হবে। আর দড়াটানা ব্রিজ থেকে কাঠেরপুর পর্যন্ত প্রয়োগ করা হবে পানি আইন। সিএস ম্যাপে এখানে ভৈরবের প্রস্ততা কম থাকায় ‘প্লাবন ভূমির’ শর্ত মেনে সব বহুতল ভবন উচ্ছেদ করা হবে। এই আইন অনুযায়ী নদের সীমানা নির্ধারণে খুব দ্রুত একটি কমিটি গঠন করা হবে। এজন্য আমি জেলা প্রশাসকের সাথে কথাও বলেছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পানি আইনের প্লাবন ভূমির শর্তানুয়ায়ী ভৈরবের শহর অংশের দুই পাড়ের সব বহুতল ভবন অবৈধ। আইন অনুযায়ী বছরের যে কোন সময় সর্বোচ্চ যে পর্যন্ত পানি যায় তার আরো ১০ মিটার হচ্ছে প্লাবন ভূমি। নদীবন্দর ও সমুদ্র বন্দর এলাকায় এর সীমা ৫০ মিটার। সেই হিসেবে ভৈরব পাড়ের সব স্থাপনাই অবৈধ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, গত ২৮ মার্চ দড়াটানা এলাকার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রশাসন। কিন্তু উচ্চ আদালতে মামলা আর তদবিরের কারণে এই অভিযান পরে থমকে যায়। উচ্ছেদ বন্ধ করতে দখলদাররা উচ্চ আদালতে সবমিলে ৬৪টি মামলা করে। এমন পরিস্থিতিতে পানি আইন প্রয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
২০১৭ সালে ভৈরব খননে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে নদের বেশ কয়েকটি এলাকায় খনন কাজ শেষ হলেও উচ্ছেদ জটিলতার কারণে শহর অংশের চার কিলোমিটারের জন্য ঠিকাদারই মিলছিলো না। তবে ষষ্ঠবারের চেষ্টায় ঠিকাদার মিলেছে। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে তারা এই খনন কাজ শেষ করবে। কাজটি সঠিকভাবে করতে তাই প্রশাসন এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পানি আইন প্রয়োগের।