ক্রিকেটার কাজলের ডানহাতি থেকে বাঁহাতি হওয়ার গল্প

সমাজের কথা ডেস্ক॥ মানুষ কি ডানহাতি অথবা বাঁহাতি হয়ে জন্মায়? কীভাবে একজন মানুষ ডানহাতি বা বাঁহাতি হয়ে বেড়ে ওঠে? বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় মোহাম্মদ কাজল হোসেনের জীবনে রয়েছে অন্য রকম অভিজ্ঞতা। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পাঁচ জাতির টুর্নামেন্ট খেলতে ২৮ বছরের এই তরুণ এখন রয়েছেন ইংল্যান্ডের উস্টার শহরে। সেখানেই কাজল বলেছেন তার জীবনের গল্প। কাজল ছিলেন ডানহাতি। ডান হাতেই তিনি পেস বল করতেন। বড় হয়ে বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন তার থমকে যায় একটি দুর্ঘটনায়। বল ছোড়ার সেই ডান হাত হয়ে যায় অকেজো । কিন্তু তাতে থামানো যায়নি ক্রিকেট পাগল কাজলকে। অল্প কিছু দিন পরই তিনি বাঁ হাতে ক্রিকেটে ফেরার সাধনা শুরু করেন। কাজলের এই গল্পটি কেবল তার ক্রিকেটে ফেরার গল্প নয়। এটা কাজলের জীবনে ফেরার গল্প। সময়টা ২০০৫ সাল। ঢাকার দোহারের ছেলে কাজল তখন স্কুলের ছাত্র। গ্রামের এই মাঠ ওই মাঠ মাতিয়ে বেড়ানো কাজলের আরেকটি পরিচয় গড়ে উঠে তখনই। কাজল পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ক্রিকেটার কাজল’ হিসেবে। কিন্তু তখনই একটি দুর্ঘটনা দুমড়ে মুচড়ে দেয় কাজলের জীবন। দুর্ঘটনায় হাত ভেঙে যায় কাজলের। যথাযথ চিকিৎসার বদলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রাম্য কবিরাজের কাছে। কবিরাজ চিকিৎসার নামে তার হাত বেঁধে দেন শক্ত করে। শক্ত বাঁধনে ব্যথা অনুভব করতে থাকা কাজল ঘরে ফিরেই বাঁধন খুলে দিতে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। স্বজনরা পাল্টা যুক্তি দেন- হাত ভেঙেছে, ব্যথাতো করবেই। একটু সহ্য করতে হবে। ভয়ঙ্কর কষ্টে পার হয় সেই রাত। কাজলের কান্নায় পরদিন তাকে আবার কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। খোলা হয় বাঁধন। দেখা যায়, একদিনেই ঘা হয়ে গেছে আঘাতের জায়গায়। এরপর ঘা সারাতে চলে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা। এক সময় আনা হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালেও। তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসার এক পর্যায়ে যখন কাজলের হাত কনুই থেকে সোজা করা হল, তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হল। টান পড়ল রগেও। এরপর চলে আরও নানা বিলম্বিত চিকিৎসা। তাতে হাত আর সোজা হল না। ডান হাতের আঙুলে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেললেন কাজল। সেই দিনগুলোর মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “যখন দেখলাম আমার ডান হাত আর কাজ করছে না। তখন মনে হল, আমি হয়ত আর ক্রিকেট খেলতে পারব না। হয়ত আর এই হাতে কোনো কাজ করতে পারবে না। ডান হাতে আর লিখতে পারব না। খুবই খারাপ লেগেছে।”
এই ঘটনা পরম্পরার মধ্যেই এগিয়ে আসে কাজলের একটি পরীক্ষা। কলম কাগজ হাতে তাকে বসতে হবে পরীক্ষার হলে। কিন্তু যে হাত দিয়ে কাজল লিখতেন, সেটা দিয়েতো আর কোনো কাজ করা যায় না। হঠাৎ করেই বাঁ হাতে সব কিছু করা যায় কি-না, সেই চেষ্টা শুরু করেন কাজল। “আমার মনে হল, মানুষেরতো দুটো হাত। একটা হাত নষ্ট হয়ে গেলে অন্য হাত দিয়ে কেন কাজ করতে পারবে না? তাই বাঁ হাত দিয়ে কাজ করতে শুরু করি। বাঁ হাত দিয়ে লেখার চেষ্টা শুরু করি। বাম হাত দিয়ে বল প্রাকটিস শুরু করি।” সেই সংগ্রামের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে কাজল বলেন, “প্রথম দুই বছর খুব কষ্ট হয়েছে। বাঁ হাতে কাজ করতে গিয়ে মনে হত, টাইমিং মিলছে না। ডান হাতের কাজ বাঁ হাতে করতে গিয়ে ভালো হচ্ছিল না। তবে আস্তে আস্তে মানিয়ে নিতে শুরু করলাম। ”প্রথম যখন বাঁ হাতে বল ধরি, তখন দেখি, একটা মানুষ সাধারণত যেভাবে বল ধরে, সেভাবে হত না। আস্তে আস্তে অনেক দিন চেষ্টা করতে করতে সেটা ঠিক হল। লেখালেখির ব্যাপারেও কষ্ট হয়েছে। প্রথম প্রথম কলম ধরতেই পারতাম না। হাতে শক্তি পেতাম না। হাত থেকে কলম পড়ে যেত। “প্রথম প্রথম পেন্সিল ছোট করে লেখার চেষ্টা করি। পরে আস্তে আস্তে কলমে লেখার চেষ্টা করি। কিছুদিন করার সেটাও ঠিক হয়।” কাজলের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। কাজলের ডান হাতে চলে আরও চিকিৎসা। সেই চিকিৎসায় কিছুটা শক্তি ফিরে আসে। আকৃতি ও শক্তিতে ডান হাত আগের অবস্থায় না ফিরলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়। বোলিং নির্ভর বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী দলে তার জায়গা হয়েছে ডানহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবেই। তবে বাঁহাতি স্পিনারের পরিচয়টিও তিনি ধরে রাখতে চান। কাজলের ক্রিকেটের এই গল্পের সাথে জড়িয়ে আছে তার জীবনের গল্পও। জীবনের অন্য কাজে তিনি এখন বাঁ হাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তার মতে, “মানুষ মনে করে, ডান হাতে অনেক শক্তি পাওয়া যায়, আর বাঁ হাতে অনেক কম শক্তি পাওয়া যায়। মানুষ বাঁ হাতকে অবহেলা করে, কাজে লাগায় না। এটা ঠিক না। “বাঁ হাত দিয়ে যদি মানুষ নিয়মিত কাজ করে, ডান হাতের পাশাপাশি বাঁ হাতও যদি নিয়মিত ব্যবহার করে, তাহলে বাঁ হাতেও অনেক কাজ করা সম্ভব।“ নিজের গ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাজল বলেন, অনেকে মনে করে, বাঁ হাতে কাজ করা ভালো না। এটা শুধুই কুসংস্কার। “ছোট বেলা থেকে যে ডান হাত বেশি ব্যবহার করবে, সে ডান হাতে শক্তি বেশি পাবে। যে বাঁ হাত বেশি ব্যবহার করবে সে বাঁ হাতে বেশি শক্তি পাবে। যে ডান হাত বাঁ হাত দুটোই ব্যবহার করবে- সে দুই হাতেই শক্তি পাবে।” কাজলের জীবনের এই গল্পের সঙ্গে পরিচিত বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের প্রধান কোচ রাশেদ ইকবালও। মানুষ চাইলে তার নির্ভরতার হাত যে পাল্টে ফেলতে পারে- কাজলের এই ধারণার সঙ্গে তিনিও একমত।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রাশেদ অলিম্পিক গোল্ড মেডেল জয়ী হাঙ্গেরিয়ান শুটার ক্যারোলি টাকাসের প্রসঙ্গ টানেন। গত শতকের ত্রিশের দশকে এই হাঙ্গেরিয়ান ডানহাতি শুটার অলিম্পিকে অংশ নিতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। পরে যখন নিষেধাজ্ঞার দেয়াল উঠল, তখন গ্রেনেড বিস্ফোরণে হারিয়ে ফেলেন ডানহাতের সেই জাদুকরি শক্তি। তাতে থেমে থাকেননি ক্যারোলি। বাঁ হাতে শুরু করেন নতুন যাত্রা। ১৯৪৮ সালের অলিম্পিকে তিনি সোনা জিতে নেন। রাশেদ ইকবাল বলেন, “ডান হাত আর বাঁ হাতের বিষয়টা আসলে প্রাকটিসের ওপর নির্ভর করে। আপনি এতদিন এক হাতকে গুরুত্ব দিয়েছেন, এখন হঠাৎ করে আরেক হাতে হয়ত সব কাজ পারবেন না। ডানহাতি কেউ যদি বাঁহাতেও একই শক্তি পেতে চান, তিনি যদি প্রাকটিস করেন, কারও ক্ষেত্রে সেটা হয়ত এক দুই বছরে হবে, কারো ক্ষেত্রে সেটা ১০ বছরও লাগতে পারে। কিন্তু এটা সম্ভব।”

শেয়ার