স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে যশোরে ১২শ’ স্কুলের শিক্ষার্থীরা
টয়লেটে সাবান থাকে না, স্যাঁতসেঁতে ও চরম দুর্গন্ধময় পরিবেশ

জাহিদ হাসান
সাড়ে ৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য একটি মাত্র টয়লেট। সেটিও নোংরা আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে। নিয়মিত হয় না পরিষ্কার। সর্বক্ষণ থাকে না পানির ব্যবস্থা। সাবান তো দূরের কথা; লাইটের বাল্ব শেষ কবে লাগানো হয়েছে কেউ বলতে পারে না। দরজা লাগানো হলে টয়লেটের ভেতরে থাকে অন্ধকার। আর মেয়েদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা তো দূরে থাক; ছেলেমেয়েদের একই টয়লেট ব্যবহার করতে হচ্ছে । এমন চিত্র দেখা গেছে যশোর শহরের কারবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শুধু এ বিদ্যালয় নয়; যশোর জেলার বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্যানিটেশনের চিত্রই এমন। শহরে হাতেগোনা দুই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের স্যানিটেশন সুবিধা একেবারেই নাজুক। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে জেলার ১২শ’ প্রাথমিকের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিও তথ্য মতে, জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতকরা ৬০ ভাগ টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী। জেলার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সাথে কথা বললে তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিষয়ে সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। টয়লেটে হ্যান্ডওয়াশ কিংবা সাবান পর্যন্ত থাকে না। মাঝে মাঝে পানিও থাকে না। অন্ধকার থাকে টয়লেট, থাকে মশার উপদ্রব। টয়লেটে নোংরা-স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, বদনা ব্যবহারের অনুপযোগী। তবে এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ একটু নজর দিলেই সমাধান সম্ভব।
শহরের কারবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফাতেমা নামে এক অভিভাবক বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষের অনীহাই মূলত টয়লেট অপরিষ্কার থাকে। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি তাদের অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। একই বিদ্যালয়ের জোহরা খানম নামে আরেক অভিভাবক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় টয়লেট অনেক কম। সবসময় নোংরা আর অপরিষ্কার থাকে। মাঝে মাঝে পানির ব্যবস্থা থাকে না। সাবানসহ হাতধোঁয়ার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। অনেক টয়লেট কোনোরকম সচল থাকলেও থাকে না লাইট, কখনও দরজা কিংবা দরজার সিটকিনি থাকে ভাঙা, বদনা ভাঙা, স্যাঁতসেঁতে আর পানি জমে থাকে।
কারবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল বসু কিছু ত্রুটি শিকার করলেও বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রতি শ্রেণিতে তিনজন করে ক্যাপ্টেন আছে। তারা এসব মনিটরিং করে।
তিনি জানান, ‘হাতধোয়ার সাবানসহ কিছু উপকরণ রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু বাচ্চারা সাবান রাখে না। পানির ট্যাপ ভেঙে ফেলে, আরো অনেক সমস্যা সৃষ্টি করে। আসলে এগুলো সামাজিক পরিবেশগত সমস্যা। এই বিষয়গুলো আমাদের কাছে দুঃখজনক বিষয়। তবে সকল মিটিংয়ে আমরা চেষ্টা করছি তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করার। শহরের মহিলা সমাজ কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিনা আক্তার বলেন, টয়লেটে পানির ব্যবস্থা রয়েছে। সকালে স্কুল শুরু হওয়ার আগে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। লাইটের আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। সাবান রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকদের বক্তব্যের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই মিল পাওয়া যায়নি সরেজমিনে স্কুল টয়লেটগুলো দেখে।
এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ এর যশোর আঞ্চলিক ম্যানেজার মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা করি। জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। আবার কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জন্য ভালো টয়লেট থাকলেও শিক্ষার্থীরা নোংরা টয়লেট ব্যবহার করে। সরকারের দ্রুত জেলার সকল বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্চিত করা উচিত।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু বলেন, এ বিষয়ে স্কুলের শিক্ষক এবং পরিবারকে সচেতনভাবে বাচ্চাদের দেখভাল করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টয়লেটগুলো প্রতিদিন ভালোভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাবান হ্যান্ডওয়াশ রাখা বাধ্যতামূলক। যে টয়লেট ব্যবহার করবে তাকে পরিষ্কার করে পর্যাপ্ত পানি ঢালতে হবে। এ সকল বিষয়ে সচেতন না হলে শিক্ষার্থীরা ডায়রিয়া, কলেরা, কৃমিসহ অনেক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শেখ অহিদুল আলম বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে স্যানিটেশন বিষয়ে আলাদাভাবে অর্থ বরাদ্দ থাকে না। ভালো স্যানিটেশন ব্যবস্থা রাখার জন্য শিক্ষকদের বলা হয়। যেখানে টয়লেট নেই, অভিযোগ পেলে সেখানে টয়লেটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।