রোহিঙ্গা ফেরাতে দ্রুত পথ তৈরির তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

সমাজের কথা ডেস্ক॥ মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজেদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বুধবার ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ঢাকা মিটিং অব দ্য গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার এ আহ্বান আসে।
মার্শাল আইল্যান্ডসের প্রেসিডেন্ট হিলদা সি হেইন, গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশনের চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি-মুন এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্রিস্টালিনা জর্জিওভাও উপস্থিত ছিলেন এ অনুষ্ঠানে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা সকলে অবগত আছেন, আমরা কক্সবাজার জেলায় মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। কক্সবাজারের যেসব এলাকায় রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে সেগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং তাদের উপস্থিতি এসব এলাকাকে আরও অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
“এসব বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দেখভাল করার পাশাপাশি অতি দ্রুততার সঙ্গে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আমি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।”
গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কীভাবে কাজ করা যায় সে দিকনির্দেশনাও দেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, অনুমিত সময়ের আগেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এ প্রভাব মোকাবিলায় বিনিয়োগে বিশ্বকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে।
“বর্তমানে এই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সকলে সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেজন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সবাইকে সজাগ থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, “গ্লোবাল কমিশন অব অ্যাডাপটেশননের সহযোগিতায় আমরা জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সঠিক অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী পন্থা ও ঝুঁকি নিরসন ব্যবস্থার সুবিধা পেতে চাই।
“আগামী সেপ্টেম্বরে ক্লাইমেট চেইঞ্জ সামিটে প্রকাশিতব্য প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর জন্য আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি। ওই সভায় এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ এবং বাংলাদেশর পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভিযোজন প্রক্রিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখানে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি রাখে। “আমি বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি।”
জলবায়ু পরিবর্তনকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রাক শিল্পায়ন যুগের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উপরে পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল।
তিনি বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এডিবির জলবায়ু এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আমাদের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ কমে যাবে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে।
“বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০ লাখ জলবায়ু অভিবাসী রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, ঘন ঘন বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রতল বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বিস্তৃত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলি কৃষি, শস্য, পশু ও মৎস্যসম্পদের বিপুল ক্ষতি করছে এবং বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন ৮ শতাংশ ও গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ কমে যেতে পারে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে বিশাল উন্নতি হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে এই অর্জনগুলি হুমকির সম্মুখীন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা আমাদের ভঙ্গুর অবস্থা কাটিয়ে উঠতে এবং জনগণের জন্য অভিযোজন ব্যবস্থা তৈরি করতে নিরলসভাবে কাজ করছি। গত এক দশক ধরে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ অভিযোজনের মাধ্যমে নিরসনের জন্য বছরে প্রায় একশো কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করছি।”
২০১৫ সালে প্যারিস সম্মেলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “অনেকের মত আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিকভাবে আমাদের এটি সমাধান করতে হবে। প্যারিস চুক্তি হচ্ছে এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর বৈশ্বিক চুক্তি।
“বান কি মুনের উদ্যোগে গঠিত পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামের (এইচএলপিডাব্লিউ) চূড়ান্ত রিপোর্টে আমরা লিখেছি ‘এভরি ড্রপ কাউন্ট’ অর্থাৎ প্রতি ফোঁটা মূল্যবান। বিশ্ব সম্প্রদায় এটি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে।”
বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার কৌশল আয়ত্তে আমরা একবারে সম্মুখভাগে রয়েছি।”

SHARE