নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ সাহসিকা জননী কবি সুফিয়া কামাল – মাহমুদা রিনি

২০ জুন ২০১৯ অকুতোভয় সংগ্রামী সৈনিক, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর দিশারী, বিপ্লবী নেত্রী কবি সুফিয়া কামালের ১০৮তম জন্মবর্ষিকী।
বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ এবং জাতীয় থেকে সকল স্তর পর্যন্ত মানুষ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে মহীয়সী এই কবি, লেখক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রীত্ব দানকারী এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মত আন্দোলনমুখি গণনারী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাহসিকা জননী কবি সুফিয়া কামালকে।
জন্মকাল : সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতার নাম সৈয়দা সাবেরা খাতুন। তাঁর বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন। ১৯১৮ সালে সুফিয়ার বয়স যখন সাত বছর তখন তাঁর বাবা কোন এক সাধক দলের অনুসরণে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। ফলে তাঁর মা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি শায়েস্তাবাদে এসে আশ্রয় নেন। এই কারণে তাঁর শৈশব কেটেছে নানার বাড়িতে।
প্রথমকাল : যে সময়ে কবি সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীদের গৃহবন্দি জীবন কাটাতে হতো। সেখানে নারী শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করা হতো না। তাঁর মাতৃকূল ছিল শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবার এবং সেই পরিবারের ভাষা ছিল উর্দু। অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি, ফারসি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলা শেখার কোন ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বাংলা শেখেন মূলত তাঁর মায়ের উৎসাহে। নানাবাড়িতে তাঁর বড় মামার একটা বিরাট গ্রন্থাগার ছিল। মায়ের সহায়তায় এই গ্রন্থাগার থেকে বই পড়ার সুযোগ ঘটেছিল তাঁর। অন্ধকার কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে সেই শিশু বয়সেই কবি সুফিয়ার চোখে ভাসে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। তিনি লেখাপড়ার প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন এবং বাইরের জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানস্পৃহা তাঁর দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বিবাহকাল : ১৯২৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে সুফিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। নেহাল হোসেন অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক ছিলেন, তিনি সুফিয়াকে সমাজ সেবা ও সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করেন। সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সাথে যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। সেই সময় তিনি বিভিন্ন বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। এই সময় তাঁর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত এর সাথেও পরিচয় হয়। উল্লেখ্য যে সেই সময় থেকেই সুফিয়া কামালের মনে বিশেষ ভাবে জায়গা করে নিয়েছিল বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ।
রচনাকাল : সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ তখনকার প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। কোলকাতায় থাকাকালীন এই সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের সাথে পরিচিত হন। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন “আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে” এর সাথে যুক্ত হন। এখানেই তিনি বেগম রোকেয়ার সাথে মিলিত হন। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তখন থেকেই তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয় যা তাঁর জীবনে সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলে।
নিজের রচনা প্রসঙ্গে তিনি স্মৃতিচারণ করেন এভাবে যে “প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্তভাব এসে মনকে যে কোন অজানা রাজ্যে নিয়ে যেত। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, বেগম সারা তাইফুর লিখছেন। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখা খেলা। কি গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া, গল্প। কিন্তু কোনোটাই কি মনের মত হয়! কেউ জানবে কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।” রচনাসমূহ : সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচর্চা চলতে থাকে। ১৯৩৭ সালে তাঁর গল্পের সংকলন কেয়ার কাঁটা প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়া’র মুখবন্ধ লেখেন কাজী নজরুল ইসলাম। এরপর তাঁর সাহিত্য প্রকাশ আর পিছু ফিরে তাকায়নি। মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, ইতোল বিতোল (শিশুতোষ), দিউয়ান, সোভিয়েতের দিনগুলি ( ভ্রমণ কাহিনী) অভিযাত্রীক, মৃতিকার ঘ্রাণ, মোর যাদুদের সমাধি পরে, নওল কিশোরের দরবারে (শিশুতোষ) একালে আমাদের কাল (আত্মজীবনীমৃলক রচনা), একাত্তরের ডায়েরী (স্মৃতিকথা) ইত্যাদি রচনাবলী বাংলা সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
সৃষ্টিশীল কর্মজীবন : ১৯৪৭ সালে তিনি কোলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। সেসময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কল্পে শান্তি কমিটি নামে একটি সংগঠন স্থাপিত হয়েছিল। প্রখ্যাত নারীনেত্রী লীলা নাগ এর অনুরোধে তিনি শান্তি কমিটির কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং সভানেত্রী মনোনীত হন। ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে পূর্বপাকিস্তানের বিভিন্ন জেলার প্রগতিশীল মহিলানেত্রী ও কর্মীদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘পূর্বপাকিস্তান মহিলা সমিতি’। এই সংগঠনের সভানেত্রী নির্বাচিত হন সুফিয়া কামাল , যুগ্ম সম্পাদিকা যুঁই ফুল রায় ও নিবেদিতা নাগ। ১৯৬৯ সালে তিনি মহিলা সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। পাকিস্তান সরকার কতৃক ইতঃপূর্বে প্রদত্ত ‘তঘমা-ই- ইমতিয়াজ পদক বর্জন করেন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।
এছাড়াও ঢাকা শহর শিশু রক্ষা সমিতি, ওয়ারি মহিলা সমিতি, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, কচিকাঁচার মেলা, নারী কল্যাণ সংস্থা, পাক সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি, মহিলা সংসদ, মহিলা পরিষদ (১৯৭০), কেন্দ্রীয় মহিলা পূনর্বাসন সংস্থা, রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মেলন পরিষদ এরকম বহু সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
ভাষা আন্দোলনে, ১৯৫০ ও ১৯৬৪ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে, ঢাকা চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন অনুষ্ঠানে, ১৯৬০ এর দশকে সরকারি ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে প্রথমে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন ও পরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিরোধী সরকারি ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে, ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনকালে, ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে, বাবরী মসজিদ ভাঙার পরবর্তী সময়ে এদেশে সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক প্রতিরোধে, মোট কথা আমাদের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে তিনি সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শাসক কিংবা প্রতিক্রিয়ার শক্তি কারোর কোনো প্রলোভন বা হুমকি তাকে তাঁর কর্তব্য পথ থেকে বিচ্যুত, সত্য উচ্চারণ থেকে বিরত করতে পারেনি। শুধু রাজনৈতিক সংকটকালেই নয়, প্রাকৃতিক- বিপর্যয়েও তিনি বার বার দুর্গত ও উৎপীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, তাদের কাছে মূর্তিময়ী বরাভয় হয়ে দেখা দিয়েছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছেন। বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। এভাবেই তিনি ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছেন আমাদের জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর, সাহসী জননী।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কাল : ১৯৭০ সালে কবি সুফিয়া কামাল মহিলা পরিষদ গঠন করেন। যুদ্ধ চলাকালীন (১৯৭১ সাল) সময়ে সুফিয়া কামাল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং পাকিস্তান সরকারের নজরকে অগ্রাহ্য করে অন্তরাল থেকে মুক্তি যোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে গেছেন। পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মহিলা পরিষদ সংগঠনটি আবার নতুন রূপে ”বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ” নামে কর্মযাত্রা শুরু করে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। প্রথম সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন মালেকা বেগম।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ : স্বেচ্ছাসেবা, দেশপ্রেম ও আদর্শবাদীতা এই সংগঠনকে দিয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে একটি প্রভাব সৃষ্টিকারী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।
দীর্ঘ এই অর্ধশতকের পথ চলায় মহিলা পরিষদ অর্জন করেছে বিপুল বিচিত্র অভিজ্ঞতা, গড়ে তুলেছে এর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। যা এটিকে অন্য অনেক সংগঠনের সাথে যেমন সমমনা করে গড়ে তুলেছে, তেমনি পাশাপাশি এটিকে অন্য অনেক সংগঠনের থেকে পৃথক এবং বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বিশেষ কতগুলি বৈশিষ্ট্য যা আজোবধি বিদ্যমান:
* অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী পুরুষের সমতাপূর্ণ, প্রগতিশীল মানবিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার নীতিমালা অনুসরণ করছে।
*স্বেচ্ছাশ্রম, দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা এর বৈশিষ্ট্য।
*সৃজনশীল পদ্ধতিতে বিরামহীন নিরলস সংগ্রাম বর্তমান সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রে বিরাজমান নারীর অধস্তন অবস্থা পরিবর্তনের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টা।
*ব্যাপক গণনারী সমাজকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে ক্ষমতায়িত করা।
*মানবাধিকারের নীতিমালা দৃঢভাবে অনুসরণ করা।
*নারীর প্রতি বিরাজমান সকল প্রকার সহিংসতা প্রতিরোধ ও বিলোপ করা।
*গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি শক্তিশালী ও স্থায়ী করা।
*অধিকার ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা।
*সংগঠনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতারা নীতি অনুসরণ করা।
*লিখিত ঘোষণাপত্র ও গঠণতন্ত্রে নীতিমালা, কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কাঠামো বিশেষভাবে অনুসরণ করা।
উপরোক্ত নীতিমালা ও আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত ও পরিচালিত এই গণনারী সংগঠন জাতীয় সংবিধান এর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারী অধিকার সমুন্নত রাখার আন্দোলনসহ সারাদেশ ব্যাপী নারীর সার্বিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
‘নারী অধিকার মানবাধিকার’ এই মূলমন্ত্র ধারণ করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত চেইন অব নেটওয়ার্কিং পদ্ধতিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা নিরলস পরিশ্রম করছে।
স্বপ্নদ্রষ্টা কবি সুফিয়া কামাল এর আদর্শ ও চেতনায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কর্মধারা প্রবাহিত হোক প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে, প্রতিটি ঘরে, সমাজে, রাষ্ট্রে এই আশাবাদ ধারন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিটি কর্মী।
কবি সুফিয়া কামাল এক মৃত্যুহীন প্রাণ। সমুদ্রের গভীরতা নিয়ে মানুষের অন্তরে বিরাজমান নারীমুক্তির এই স্বপ্নদ্রষ্টা চির জাগরূক থাকবেন অনন্তকাল।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ চিরজীবী হোক।
তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, অনুশীলন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও স্মারকগ্রন্থ, উইকিপিডিয়া, মহিলা সমাচার।

শেয়ার