যশোরের আলোচিত পার্বতী ওরফে নুসরাত হত্যা তদন্ত এগোয়নি ২০ মাসেও, গ্রেপ্তার হয়নি কেউ

লাবুয়াল হক রিপন
যশোরের আলোচিত পার্বতী রায় ওরফে নুসরাত জাহান হত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া এগোয়নি গত ২০ মাসেও। ভুক্তভোগীর পরিবার চিহ্নিত খুনিদের ছবিসহ বর্তমান ঠিকানা পুলিশকে জানালেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিহতের শিশুপুত্র অভিজিৎ রায়সহ স্বজনরা চরম উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছেন। নিরাপত্তার অভাববোধও করছেন তারা। তবে পুলিশ বলছে, আসামিদের আটকে বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। আত্মগোপনে থাকায় কিছুটা সময় লাগছে।


মামলার বাদী নুসরাতের মা যমুনা রানী বলেছেন, তাদের বাড়ি মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় গ্রামে। একমাত্র মেয়ে পার্বতী রায়কে ৯ বছর আগে মাগুরার শালিখা উপজেলার বৈখালি গ্রামের দ্বীন রায়ের ছেলে মহিতোষ রায়ের সাথে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে দেয়া হয়। দাম্পত্য জীবনে অভিজিৎ রায় নামে ৮ বছর বয়সের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তার জন্মের ১৬ মাস পর অভিজিৎকে ফেলে পিতা মহিতোষ রায় ভারতে চলে যান। আর পার্বতী রায় তার মায়ের কাছে থেকে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। একই গার্মেন্টসে চাকরির সুযোগে যশোর সদর উপজেলার মাহিদিয়া গ্রামের নিরব হোসেন ওরফে রাব্বি নামে এক যুবকের সাথে পরিচয় হয়। এক পর্যায় দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের সময় পার্বতী রায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নুসরাত জাহান নাম ধারণ করেন। তারা স্বামী-স্ত্রী শহরতলীর ঝুমঝুমপুর চান্দের মোড়ে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। আর পার্বতীর মা যমুনা দাস যশোর কুইন্স হাসপাতালে চাকরির সুবাধে শহরের আরএন রোডের মতিয়ার রহমানের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। একই বছরের ১৭ অক্টোবর বিকেলে ঝুমঝুমপুরের ভাড়া বাসা থেকে মায়ের বাসায় বেড়াতে আসেন পার্বতী। ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আরএন রোডের সুধীর বাবুর কাঠগোলায় কালী পূজা দেখতে যান পার্বতী। পূজার মাঠ থেকে পার্বতীর স্বামী রাব্বি, তার সহযোগী মাহিদিয়া গ্রামের বিপুল হোসেন ও মিলন হিজড়া পার্বতীকে ডেকে নিয়ে যায়। রাতে বাড়ি না ফেরা এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে তাকে উদ্ধারে ব্যর্থ হন মা-বাবাসহ আত্মীয় স্বজন। পরদিন ২০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পার্বতীর পিতা মালঞ্চি গ্রামে রাব্বির বাড়িতে যান। সেখানেও কোন সন্ধান না পেয়ে ফিরে আসার সময় রাব্বির এক চাচা বলেন ২/৩দিন অপেক্ষা করেন কিছু একটা বোঝা যাবে। এরই মধ্যে পুলেরহাটে একটি চায়ের দোকানে এলে লোকমুখে শুনতে পান পতেঙ্গালি-মালঞ্চি রাস্তার মাঝে মুছার বান্দালের পাশ থেকে অজ্ঞাতনামা একটি লাশ উদ্ধার করেছে স্থানীয়রা। এরপর সেখানে গিয়ে তিনি মেয়ে পার্বতীর পরিচয় সনাক্ত করেন। এঘটনায় নিহতের মা যমুনা রানী বাদী হয়ে জামাই রাব্বি, একই গ্রামের বিপুল হোসেন ও মিলন হিজড়ার নাম উল্লেখ করে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।
প্রথমে থানার এসআই মোকলেছুজ্জামান এবং পরে সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক হারুন অর রশিদ মামলাটি তদন্ত করেন। যদিও ঘটনার দুই বছর হতে চলেছে এখনো পার্বতীর খুনিদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক হারুন অর রশিদ বলেছেন, পার্বতীর খুনিদের আটকের জন্য একাধিকবার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু তারা অল্প সময়ে স্থান পরিবর্তন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া তারা নাম পরিবর্তন করে আত্মগোপনে থাকায় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, গত ২১ মাসেও আলোচিত পার্বতী রায় ওরফে নুসরাত জাহান হত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া এগোয়নি বলে দাবি করেছেন নিহতের মা যমুনা রায়। মাঝে মধ্যে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মূল আসামি রাব্বি মামলা প্রত্যাহারের জন্য পার্বতীর মাকে হুমকি দিয়ে আসছে। তাছাড়া চিহ্নিত খুনিদের ছবিসহ বর্তমান ঠিকানা পুলিশকে জানানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিহতের ৮ বছর বয়সের শিশুপুত্র অভিজিৎ রায়ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এ নিয়ে স্বজনরা চরম উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছেন।

SHARE