ভেজাল বন্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ চায় হাইকোর্ট

সমাজের কথা ডেস্ক॥ খাদ্যনিরাপত্তা প্রশ্নেও মাদকবিরোধী অভিযানের মত ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে ভেজাল বা নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হাই কোর্ট।
এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে রোবববার ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্য অপসারণের আদেশ দিতে গিয়ে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ এই আহ্বান জানায়।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, “সরকার ও সরকার প্রধানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রয়োজনে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, যেমন মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে করা হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবছর মে মাসে এক অনুষ্ঠানে জঙ্গি দমনের মত ‘মাদক ব্যবসায়ী’ দমনে ‘বিশেষ অভিযান’ শুরুর কথা জানান।
ওই অভিযান সফল করতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা নিয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পরে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত এই ‘যুদ্ধ’ চলবে।
শুরুতে র‌্যাব এই অভিযানে থাকলেও পরে গোয়েন্দা পুলিশ, রেল পুলিশ, থানা পুলিশ এবং বিজিবিকেও মাদকবিরোধী অভিযানে দেখা যায়।
এই ‘যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে গত এক বছরে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলেছে। মাদক উদ্ধার, আটক-গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে সন্দেহভাজন বহু মানুষ।
এবার রোজার আগে বাজারের বিভিন্ন পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে বিএসটিআই ১৮ কোম্পানির ৫২টি পণ্যে নির্ধারিত মান না পাওয়ার কথা জানালে বিষয়টি হাই কোর্টে আনে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার সোসাইটি (সিসিএস)।
তাদের রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি করে হাই কোর্ট রোববার যে আদেশ দিয়েছে, সেখানে বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ১৮ কোম্পানির ৪৬টি ব্র্যান্ডের ৫২টি পণ্য বাজার থেকে অপসারণ করে উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বাজারে থাকা এসব পণ্য দ্রুত অপসারণ করে ধ্বংস করার পাশাপাশি মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করে আগামী ১০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মামলাটি আগামী ২৩ মে পরবর্তী আদেশের জন্য রেখেছে আদালত।
আদালত আদেশে বলেছে, “খাদ্য মানের এই পরীক্ষা শুধু রোজার মাসেই হওয়া উচিৎ না। সারা বছরই এ অভিযান থাকা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা শুধুমাত্র একজন কর্মকর্তা হিসেবে না, একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে জনসাধারণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে যেন তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। আদালত সেটাই প্রত্যাশা করে।”
নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব প্রসঙ্গে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন,“যদিও এ বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের। আদালতের এগুলো দেখার বিষয় না। তারপরও জনস্বার্থ বিবেচনায় এ বিষয়গুলো আদালত এড়িয়ে যেতে পারে না।
“খাদ্য নিরাপত্তার ব্যপারে আপস বা বরদাস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রত্যেকটা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানর সমন্বিতভাবে কাজ করা উচিত।”
খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়ে বিচারক বলেন, “খাদ্যে ভেজাল আর চলতে পারে না। নির্বাহী কর্তৃপক্ষ কোন দিকে অগ্রাধিকার দেবে যদিও তা আদালতের বলে দেওয়ার বিষয় না, তবে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টিকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়েই কাজে নামা উচিত।”
পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা যেন সাধারণ মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে, সে বিষয়েও নজর দিতে বলেছে আদালত।

৫২টি মানহীন খাদ্যপণ্য বিক্রি বন্ধের নির্দেশ // লিডের নিচে /৩
সমাজের কথা ডেস্ক॥ বিএসটিআইর মানের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি খাদ্যপণ্য বিক্রি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট, ব্যবস্থা নিতে বলেছে উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে।
বাজারে থাকা ১৮টি কোম্পানির এসব পণ্য দ্রুত অপসারণ করে ধ্বংস এবং মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার উৎপাদন বন্ধ করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএসটিআইর প্রতিবেদন শিল্প মন্ত্রণালয় প্রকাশের পর একটি রিট আবেদনে রোবববার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করে আগামী ১০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে : সরিষার তেল- সিটি অয়েল মিলের তীর, গ্রিন ব্লিসিং ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানির জিবি, বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের রূপচাঁদা, শবনম ভেজিটেবল অয়েলের পুষ্টি ব্র্যান্ডগুলো।
লবণের মধ্যে রয়েছে- এসিআই, মোল্লবো সল্ট, মধুমতি, দাদা সুপার, তিন তীর, মদিনা, স্টারশিপ, তাজ ও নূর স্পেশাল ব্র্যান্ডগুলো।
মসলার মধ্যে রয়েছে- ড্যানিশ, ফ্রেশ, বাঘাবাড়ি স্পেশাল, প্রাণ ও সান এর গুঁড়া হলুদ; এসিআই ফুডের পিওর ব্র্যান্ডের গুঁড়া ধনিয়া।
লাচ্ছা সেমাইয়ের মধ্যে রয়েছে- মিষ্টিমেলা, মধুবন, মিঠাই, ওয়েলফুড, বাঘাবাড়ি স্পেশাল, প্রাণ, জেদ্দা, কিরণ ও অমৃত ব্র্যান্ডগুলো।
নুডলসের মধ্যে রয়েছে- নিউজিল্যান্ড ডেইরির ডুডলি নুডলস। কাশেম ফুড প্রোডাক্টের ‘সান’ ব্র্যান্ডের চিপসও এই তালিকায় রয়েছে।
গত ২ মে শিল্প মন্ত্রণালয় এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, বিএসটিআই রোজার আগে বাজার থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫২টি নিম্নমানের পণ্য চিহ্নিত করেছে।
এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে এবং অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন।
এরপর এসব খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার, জব্দ ও মান উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে গত ৮ মে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার সোসাইটি (সিসিএস)’র পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান এই রিট আবেদন করেন।
পরদিন ওই রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে মানহীন খাদ্যপণ্যের তালিকা দেখে বিচারক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, “কোনো কোম্পানিই তো বাদ নাই।”
এসব পণ্যের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জানাতে আদালত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দুজন কর্মকর্তাকে তলব করে।
বিএসটিআই’র উপ-পরিচালক মো. রিয়াজুল হক ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক সহদেব চন্দ্র সাহা রোববার হাজির হওয়ার পর রুলসহ আদেশ দেয় হাই কোর্ট।
বিএসটিআই’র ল্যাব পরীক্ষায় ধরা পরা ৫২টি নিম্নমানের খাদ্যপণ্য দেশের বাজার থেকে প্রত্যাহার বা জব্দ করতে এবং বিএসটিআই’র নির্ধারিত মান লঙ্ঘন করে নিম্নমানের ৫২টি খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে আদালত।
খাদ্য, বাণিজ্য, শিল্প সচিব, বিএসটিআইর মহাপরিচালক (ডিজি), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

শেয়ার