রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার টিকবে আর ৫০ বছর?

সমাজের কথা ডেস্ক॥ বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বিপন্ন হিসেবে এখনই চিহ্নিত; তবে এই প্রাণীটি যে কতটা হুমকির মধ্যে রয়েছে, তা উঠে এল নতুন এক গবেষণায়।
জাতিসংঘের সর্ব সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থলের নিশানা মুছে গিয়ে হারিয়ে যেতে পারে এই প্রাণীটি।
“২০৭০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সুন্দরবনে আর বাঘের আবাস থাকবে না,” উপসংহার টানা হয়েছে ১০ জন গবেষকের তৈরি করা এই প্রতিবেদনে, যা তুলে এনেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে বাংলাদেশ ও ভারতের ৪ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিশ্বের সব চেয়ে বড় বাদাবন সুন্দরবনে আছে কয়েকশ প্রজাতির প্রাণী; আর তার মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে রয়েছে বেঙ্গল টাইগার।
সুন্দরবনের ৭০ শতাংশই এলাকাই সমুদ্র সমতল থেকে মাত্র কয়েক ফুট উঁচুতে; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ তাই অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের গবেষকদের। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের ২০১০ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১১ ইঞ্চি বাড়লে কয়েক দশকের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হবে সুন্দরবনের ৯৬ শতাংশ বাঘ।
অন্য এক গবেষণার বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমসে সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনে ফলে ইতোমধ্যে বিশ্বের বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রায় অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্ত।
আগে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, এই ক্ষতি তার চাইতে বেশি বলে এখন দাবি করেছেন গবেষকরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বাইরেও বাঘের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করেছেন এ গবেষণা প্রতিবেদনের মূল লেখক শরীফ এ মুকুল ও তার সহকর্মীরা।
তাতে বলা হয়েছে, শুধু সমুদ্র তলের উচ্চতা বাড়ার কারণেই ২০৫০ সাল থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে বাঘের আবাসস্থলের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর অন্যসব কারণে এই সময়ের মধ্যে বাঘের আবাসস্থল পুরোপুরিই মুছে যাবে সুন্দরবন থেকে।
২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় পায়ের ছাপের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত জরিপে সুন্দরবনে ৪৪০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার গণনা করেছিল।
২০০৬ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও আপেক্ষিক সংখ্যা পদ্ধতি অনুসরণ করে শুমারি চালিয়ে দেখা যায়, কমে এসেছে বাঘের সংখ্যা; ওই জরিপে ২০০টি বাঘ পাওয়া গিয়েছিল।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বাঘ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা কমে ১০৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
১৯ শতকের গোড়া থেকে আবাসস্থল ধ্বংস, শিকার ও বেআইনিভাবে অঙ্গ পাচারের কারণে গোটা পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা এক লাখ থেকে কমে এখন ৪ হাজারেরও নিচে এসে ঠেকেছে। তিন প্রজাতির বাঘ এরই মধ্যে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাত্র ১৩টি দেশে এখন টিকে আছে বাঘ। বিরূপ আবহাওয়া আর বন উজার করার কারণেও সুন্দরবনে হ্রাস পাচ্ছে বাঘের সংখ্যা।
সুন্দরবনে বন্যা হলে নতুন আবাসের খোঁজে বন ছেড়ে নিকটবর্তী জনবসতিতে মানুষের সঙ্গে বাঘের লড়াইয়ের ঘটনা বাড়বে; এতে বাঘের জীবনের হুমকি আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। “অনেক কিছুই ঘটতে পারে,” উদ্বেগ জানিয়ে বলছেন ঢাকার ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সহকারী অধ্যাপক মুকুল।
তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “সঙ্কট আরও বাড়বে যদি ঘূর্ণিঝড় হয়, কোনো অঞ্চলে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, অথবা খাদ্যাভাব দেখা দেয়।”
গত অক্টোবরে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হতে থাকে, তাহলে ২০৪০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেড়ে যাবে।
আর এর প্রভাব পড়বে খাদ্যশৃঙ্খল, প্রবাল দ্বীপ ও বন্যাপ্রবণ এলাকায়। এতে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র, ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর ১৬ কোটি মানুষের আবাস।
অবশ্য এসব গবেষণায় উঠে আসা উদ্বেগের সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী সুগতা হাজরা বলেন, সুন্দরবন বড় জোর কিছু ভূমি হারাতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের বাঘের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব তেমন হবে না বলেই মনে করছেন হাজরা।
নিচু এলাকা ও বাঘের বসতি এলাকা সংরক্ষণে ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশের বন বিভাগের কর্মকর্তা জহির উদ্দিন আহমেদও। পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে গেলেও টিকে থাকতে পারে এমন ফসল লাগানোর কথা তিনি বলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসকে।
“এছাড়া সরকার ঝড় সুরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করেছে। পলি বিন্যাসের মাধ্যমে কয়েকটি দ্বীপের উচ্চতা প্রাকৃতিকভাবেই বেড়েছে।”

শেয়ার