ধেয়ে আসছে শক্তিশালী ‘ফণী’

# আজ আঘাত হানতে যাচ্ছে ভারতে উপকূলে
# সন্ধ্যায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাবে
# মোকাবিলায় সব প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
# ১৯ জেলায় প্রস্তুত ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ভারতের উপকূলে আঘাত হানতে শুরু করেছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণী। এর প্রভাবে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তনমে ১১০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছে। সেই সঙ্গে হচ্ছে তুমুল বৃষ্টি। জানা যায়, তীব্র বাতাসে অঞ্চলটির বাসিন্দাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে নিরাপদে আশ্রয় নিচ্ছে সবাই। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ব্যাপক শক্তি সঞ্চয় করে শুক্রবার দুপুরে ভারতের ওড়িষা উপকূলে আঘাত হানতে যাচ্ছে, এরপর ঝড়টি পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যাবে।
ঘূর্ণিঝড় ফণী শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে ধরে নিয়ে আজ সকাল ১০টা থেকে উপকূলীয় জেলাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে আনা হবে। সকালে শুরু করে সন্ধ্যার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে আনার কার্যক্রম শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়। সভায় জানানো হয় ১৯ উপকূলীয় জেলায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে তারা মানুষদের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।
এদিকে বৃহস্পতিবারই ভারতেই অন্ধ্র প্রদেশে ফণীর বাতাসের তোড়ে বিভিন্ন রাস্তার পাশে গাছ এবং ইলেকট্রিক খুঁটি উপড়ে পড়েছে। এরই মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় কাঁচা বাড়ির বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। প্রতিটি ব্লকে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রস্তুত আছে পুলিশ-প্রশাসন।
ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এপ্রিল মাসে বঙ্গোপসাগরে ও ভারত মহাসাগরে যতগুলো ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে তার কোনোটি কখনই ফণীর মতো এতো শক্তিশালী আকার ধারণ করেনি।
এদিকে ফণীর কারণে আগামী ৩ ও ৪ মে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর খোলা থাকবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত দু’টি অফিস আদেশ জারি করেছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ভারতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে, যার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়।
সভার শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল শুক্রবার সকালে কাজ শুরু করে সন্ধ্যার মধ্যে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
প্রথমে নারী, শিশু ও বয়স্কদের আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, “লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনার পর সেখানে (ওইসব অঞ্চলে) পাহারা রাখতে হবে, শেল্টারগুলোও পাহারায় রাখতে হবে।”
আশ্রয় কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের নিরাপত্তায় সজাগ থাকতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান।
ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯ উপকূলীয় জেলায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে তারা মানুষদের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।
উপকূলীয় ১৯ জেলায় তিন হাজার ৮৬৮টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। বেশিরভাগ আশ্রয় কেন্দ্রই প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সভায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, “শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ পুরো বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ের আওতায় থাকবে, এই সময়টা ক্রিটিক্যাল। উচ্চগতির বাতাস ও দমকা ঝড়ো হাওয়ার সময় সবাইকে নিরাপদে থাকতে হবে।
“ঘূর্ণিঝড়টি শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সারা রাত বাংলাদেশ অতিক্রম করবে। বাংলাদেশ যখন অতিক্রম করবে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার থাকতে পারে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে।”
তিনি বলেন, মহাবিপদ সংকেত দেওয়ার সময় এখনও হয়নি। ঘূর্ণিঝড়টি শুক্রবার সকাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শামসুদ্দিন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে সবাইকে এ বিষয়ে জানাতে হবে, এজন্য বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে। কারণ ঘূর্ণিঝড় আঘাতের আগে তথ্য পেলে মানুষ নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিতে পারবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, “ভালো প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, আমরা মোকাবেলা করতে পারব, প্রাণিসম্পদও রক্ষা করতে পারব।”
আশ্রয় কেন্দ্রে ঠিকমতো খাবারের ব্যবস্থার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, “খাবারের অভাবে কেউ যেন আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ির দিকে না যায়।”
মোমবাতি ও কুপি বাতির পরিবর্তে হ্যাজাক লাইটের ব্যবস্থা করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
এনামুর বলেন, “আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি তারা যেন দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন।”
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান বলেন, “অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের প্রস্তুতি ভালো। প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা আগেভাগে সংবাদ পাচ্ছি, আন্তঃদেশীয় তথ্য বিনিময় হচ্ছে।
“প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সার্বিক সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী লন্ডন যাওয়ার আগে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। ১৯ জেলার ডিসিদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেছি, তারা পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত।”
নজিবুর বলেন, জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সবাইকে সতর্ক রাখা হয়েছে যেন দুর্যোগ প্রশমিত হয়, জানমাল রক্ষা পায়।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের রক্ষায় সমন্বতিভাবে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্য সচিব।
“নিরন্তর মনিটরিং করব, কোথাও যদি দূর্বলতা দেখা দেয় সেটা কাটিয়ে উঠব। যত আগে জনগণকে সরিয়ে নেওয়া যাবে ঝুঁকি তত কমে।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী জানান, ঝড়ে খুলনা অঞ্চলে ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্র থেকে ঘূর্ণিঝড় ফণী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে।
৯৫৪৫১১৫, ৯৫৪৯১১৬, ০১৭৫৫৫৫০০৬৭ নম্বরে ফোন করে, ৯৫৪৯১৪৮, ৯৫৪০৫৬৭ নম্বরে ফ্যাক্সে এবং হফৎপপ@সড়ফসৎ.মড়া.নফ ইমেইল করা যাবে।
ঘূর্ণিঝড় ফণীর বিষয়টি ‘সর্বোচ্চ গুরুত্ব’ দিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একটি কন্ট্রোল রুম খুলেছে বলে এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে।
সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৮০১/ক কক্ষে স্থাপিত এই কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন নম্বর ০২-৯৫৪৬০৭২।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরি তথ্য ও নির্দেশনা আদান-প্রদানের জন্য এ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফণী উপকূল অতিক্রম করার সময় বাংলাদেশের উপকূলীয় নিচু এলাকাগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবাহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, সামনে অমাবস্যা থাকায় উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরাঞ্চলে এই জলোচ্ছ্বাস দেখা যেতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের স্থলভাগ পার হওয়ার সময় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলায় ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ এবং সেই সঙ্গে ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১১০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঝড়ো হাওয়ায় জানমালের ক্ষতির পাশাপাশি জলোচ্ছ্বেসের কারণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড় আঘাত আনার আগেই উপকূলীয় নিচু এলাকা থেকে মানুষ ও গবাদি পশু সরিয়ে নেওয়া হয় তবে প্রাণক্ষয় কমানো যায়।
ফণীর সম্ভাব্য ক্ষয়-ক্ষতি এড়াতে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের ইতোমধ্যে সতর্ক করা হচ্ছে। অল্প সময়ের নোটিসে তারা যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে, সেজন্য প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় উচ্চতার জলোচ্ছাস দেখা গিয়েছিল ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সময়।
ওই বছরের ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ের সময় ১০ থেকে ৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছিল চট্টগ্রামের নিচু এলাকা। ঝড় উপকূল পার হওয়ার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ২২৪ কিলোমিটার।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় চট্টগ্রামে ১২ থেকে ২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল। ওই ঝড়ের সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ছিল ২২৫ কিলোমিটার।
ফণীর কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই উত্তাল থাকায় উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরা ট্রলার ও নৌকাকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের নিরাপদ আশ্রয়েই থাকতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়া অফিস বলছে, মোটামুটি ৩০০ কিলোমিটার ব্যাসের এ ঝড় শুক্রবার ভারতের ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করে সন্ধ্যার দিকে খুলনাসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে পৌঁছাতে পারে। তবে ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলে দেখা দিতে পারে শুক্রবার সকাল থেকেই।
জ্যেষ্ঠ আবহওয়াবিদ আবদুল মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব মানে হচ্ছে, আকাশে মেঘ দেখা যাবে, বৃষ্টিপাত শুরু হবে, বাতাস শান্ত থেকে অশান্ত হয়ে উঠবে।”
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শেয়ার