ভবদহে ৬৭৫ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা

মোতাহার হোসেন, মণিরামপুর থেকে॥ প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভবদহ পাড়ের কান্নার রোল ঠেকাতে পানি নিষ্কাশনে নদী ও খাল খননে ৬শ’ ৭৫ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) এ সংক্রান্ত সুপারিশমালার নথি যাচাই-বাছাই শেষ করেছে। আজ বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। এতথ্য নিশ্চিত করেছেন যশোর পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর গোস্মামী। তবে ভবদহের অভিশাপে ভবদহ পাড়ের পোড়খাওয়া মানুষ ও পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প বাদ দেয়া হয়েছে। টিআরএম নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ দ্বিধাবিভক্ত হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, যশোর ও খুলনা জেলার বিল কপালিয়া, বিল ভায়না, বিল খুকশিয়া, বিল বোকড়সহ ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রবাহ পথ ভবদহ স্লুইসগেট। ভবদহ স্লইসগেটের উভয় পাশের নদীসহ তৎসংলগ্ন খাল পলিতে ভরাট হওয়ায় জোয়ারের পানি উপচে পড়ছে গ্রাম রক্ষাবাঁধের উপর। এর ফলে গ্রাম রক্ষাবাঁধ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে ভবদহ পাড়ের লাখো ভুক্তভোগী।
এদিকে দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি টিআরএম প্রকল্প বাদ দেয়ায় এ অঞ্চলের অধিকাংশ ভুক্তভোগী মানুষ ও ভবদহ পানি সংগ্রাম কমিটির মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের একটাই দাবি টিআরএম ছাড়া স্থায়ী জলাবদ্ধতার হাত থেকে রেহায় পাওয়ার কোনো বিকল্প পন্থা হতে পারে না। এর আগে ২০১৮ সালে ২ আগস্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে টিআরএম প্রকল্প চালুসহ ভবদহের সার্বিক উন্নয়নে ৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি বিশাল বাজেটের প্রকল্প অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। পরের মাসেই আবার ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে মন্ত্রণালয়। ভবদহ অঞ্চলে জনগণের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তির অজুহাত দেখিয়ে টিআরএম প্রকল্প বাদ দেয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টিআরএম প্রকল্প বাদ দেয়ার পর পুনরায় নতুন করে খাল ও নদী খনন প্রক্রিয়ায় আনাসহ ভবদহ উন্নয়নে একটি বিশাল বাজেটের প্রকল্প যাচাই-বাছাই করতে পাউবোকে দায়িত্ব দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
পাউবো’র যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্মামী জানান, ২০১৮ সালে (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) তিন মাস মাঠ পর্যায়ে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। একই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ৬৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ডে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে একটি সুপারিশকৃত নথি আজ বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি (প্রকল্পভুক্ত) হতে পাঠানো হতে পারে। অচিরেই মন্ত্রণালয় হতে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন হবে বলেও তিনি জানান।
সূত্র আরো জানায়, কপোতাক্ষ নদ, ভৈরব, হরিহর, মুক্তেশ্বরী, টেকা নদীসহ ৬০টি খাল খনন ও ভবদহের সার্বিক উন্নয়নে ৬৭৫ কোটি টাকার বিশাল অংকের এ বাজেট গ্রহণ করা হয়েছে।
কথা হয় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিৎ বায়ালীর সাথে। তিনি শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, টিআরএম প্রকল্প ছাড়া ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমাধান সম্ভব নয়। এ এলাকায় এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, অচিরেই টিআরএম চালু না হলে আগামী দুই/এক বছরের মধ্যে ভবদহের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে এ এলাকায় চরম মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন এ সংগ্রামী নেতা। তিনি দাবি করেন, ভবদহ সংলগ্ন বিলের ভেড়িবাঁধ কেটে দিয়ে জোয়ারআধার সৃষ্টি করা হলে নদীগুলো নাব্যতা ফিরে পাবে। তিনি বিল খুকশিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, ২০০৫ সালে ওই বিলে টিআরএম চালু করা হয়। বর্তমানে ওই বিলে ফসল ফলাচ্ছে কৃষকরা। তার সাফ কথা প্রতিটি নদীর ৩০ মাইল অন্তর বিলের সাথে কেটে দিলে পলি অপসারণ হবে। এতে করে নদীর নাব্যতা ফিরে আসবে।

শেয়ার