নুসরাত হত্যা : দ্রুতগতিতে চলছে তদন্ত

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে নির্যাতন ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। নুসরাত হত্যার ‘পরিকল্পনাকারীদের একজন’ রানাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। এর আগে এই হত্যা মামলায় আটক ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। পাশাপাশি হত্যায় যারা বোরকা পরে অংশ নিয়েছিল তাদের একজনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে খাল থেকে একটি বোরকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পিবিআই।
ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। গ্রেপ্তার ইফতেখার উদ্দিন রানা (২১) ওই হত্যাকা-ের পরিকল্পনাকারীদের একজন বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য।
পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মঈনউদ্দিন জানান, শনিবার ভোর রাতে রাঙামাটি সদরের টিঅ্যান্ডটি আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সোনাগাজীর চরগনেশ এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে রানা ওই হত্যাকা-ের পর পালিয়ে রাঙামাটি চলে গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
পিবিআই কর্মকর্তা মঈনউদ্দিন বলেন, নুসরাত পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তাই ভাই যে মামলা করেছেন সেখানে ইফতেখার উদ্দিন রানার নাম নেই। তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য বেরিয়ে আসে।
কারাগারে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে দেখা করে আসার পর তার অনুসারীরা হোস্টেলে যে বৈঠকে বসে নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন, সেই বৈঠকে ছিলেন ইফতেখার রানা। রানাকে শনিবার ফেনীতে পাঠানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রোববার এই আসামিকে আদালতে হাজির করা হবে।
এদিকে, রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। আদালত পুলিশের পরিদর্শক গোলাম জিলানি জানান, শনিবার সন্ধ্যায় ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমেদ এই আদেশ দেন।
বিকালে পুলিশ রুহুল আমিনকে আদালতে হাজির করে নুসরাত হত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের হেফাজতের (রিমান্ড) আবেদন করে বলে তিনি জানান।
শুক্রবার বিকালে নিজ বাড়ি থেকে রুহুল আমিনকে আটক করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। নুসরাত হত্যাকা-ে এ পর্যন্ত রুহুল আমিনসহ ১৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
আর রাফিকে পুড়িয়ে হত্যায় যারা বোরকা পরে অংশ নিয়েছিল তাদের একজনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে খাল থেকে একটি বোরকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পিবিআই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনীর পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম বলেন, নুসরাতের সহপাঠী রিমান্ডে থাকা জোবায়েরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার দুপুরে সোনাগাজী সরকারি কলেজের পেছনের খাল থেকে তারা এই বোরকাটি উদ্ধার করেন।
জোবায়ের এই মামলার এজহারভুক্ত আট আসামির একজন। তাকে গত ৯ এপ্রিল সোনাগাজী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জোবায়ের এখন রিমান্ডে রয়েছেন।
পরিদর্শক শাহ আলম বলেন, “নুসরাতের সহপাঠী জোবায়ের এই হত্যাকা-ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনাগাজী সরকারি কলেজের পেছনে একটি খালে অভিযান চালানো হয়। সেখানে থেকে হত্যার সময় ব্যবহৃত তিনটি বোরকার একটি উদ্ধার করে পিবিআই।
“এর আগে শুক্রবার দুপুরে অপর আসামি কামরুন নাহার মনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই জেনেছে সোনাগাজী পৌরশহরের মানিক মিয়া প্লাজার একটি দোকান থেকে মনি বোরকা কেনেন। হত্যাকা-ে অংশ নেওয়া পুরুষদের গায়ে যে তিনটি বোরকা ছিল তার একটি উদ্ধার করল পিবিআই।”
সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে এ বছর আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নুসরাত। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি।
গত ২৬ মার্চ নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার মামলা করার পরদিন সিরাজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় ৬ এপ্রিল পরীক্ষার হল থেকে মাদ্রাসার একটি ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয় বোরকা পরা কয়েকজন।

আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, আগুন দেওয়ার সময় প্রথমে চারজনের নাম পাওয়া গেলেও তদন্তে তারা নিশ্চিত হন যে সেখানে পাঁচজন ছিল।
ওই পাঁচজন হলেন- শাহাদাত হোসেন শামীম, যোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন, অধ্যক্ষের ভায়রার মেয়ে উম্মে সুলতানা পপি ও কামরুন নাহার মণি। নুসরাতের সহপাঠী পপি ও মনিও এবার ওই মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।
ওই পাঁচজনসহ মোট ১৭ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। হত্যাকা-ে জড়িত দুই আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক যে জবানবন্দি দিয়েছেন, সেখানে পুরো ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
সেই জবানবন্দি অনুযায়ী ৪ এপ্রিল রাতে এক গোপন বৈঠকে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা হয়। রাঙামাটি থেকে গ্রেপ্তার ইফতেখার উদ্দিন রানাও উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। আর হত্যাকা-ের দিন পপি কৌশলে নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে গেলে আরও কয়েকজনের সঙ্গে গেইটে পাহারায় ছিলেন রানা।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতের পরিবারের দায়ের করা মামলা তুলে না নেওয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন তার গায়ে আগুন দেয় বলে গ্রেপ্তারদের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে।
এসব ঘটনায় রুহুল আমিনসহ কমিটির কয়েকজনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
একই অভিযোগে এর আগে সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গণমাধ্যমে এসেছে, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর শাহাদাত হোসেন শামীম ফোন করে রুহুল আমিনকে ঘটনা জানিয়েছিলেন।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশেই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করার কথা জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা, সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, নুসরাতের সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, ব্যাংকার কেফায়াত উল্যাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, যোবায়ের হোসেন, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, আব্দুল কাদের, আব্দুর রহিম শরিফ ও ইফতেখার উদ্দিন রানা।

শেয়ার