যশোর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নেই বক্ষের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা
যন্ত্রপাতি সংকটে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বঞ্চিত রোগীরা

যশোর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল

এস হাসমী সাজু
প্রতিষ্ঠার পর থেকে রোগী আনার জন্য যশোর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স। নেই বক্ষব্যাধি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা। আবার যক্ষ্মার চিকিৎসা ছাড়া এখানে রোগীরা পান না বুকের অন্য রোগের চিকিৎসা। এ অবস্থা চলছে বছরের পর বছর। এদিকে, সন্ধ্যা হলেই হাসপাতাল চত্বরে নেশাখোররা আড্ডা দেয়। আর দিনের বেলায় থাকে গরু-ছাগলের দখলে। এভাবেই সমস্যার বোঝা নিয়ে ৫৮ বছর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে যশোরের একমাত্র বক্ষব্যাধি হাসপাতালটির কার্যক্রম।
হাসপাতাল সূত্র মতে, যশোর শহরের বকচর এলাকায় তিন একর জমির উপরে ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয় যক্ষ্মা হাসপাতাল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ১৯৯৭ সালে হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে হয় যশোর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল। কিন্তু এখানে যক্ষ্মা ছাড়া বক্ষের অন্য কোনো রোগের চিকিৎসা করা হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে যক্ষ্মা বাদে শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক ব্রংকাইটিস এজমার রোগী আসলে কর্মচারী-কর্মকর্তারা জেলা সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। এ হাসপাতালটিতে যক্ষ্মা রোগী থাকলেও রোগ নির্ণয়ের কোনো যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ নেই। ফলে শহরের সরকারি- বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্র্যাক থেকে শরীরের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয় রোগীদের।
সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার সরিফা খাতুনের সাথে। তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে এক কিলোমিটার দূরে শহরের বেজপাড়ায় টিবি ক্লিনিক আছে। রোগীরা সেখানে প্রথমে চিকিৎসককে দেখান। পরে ব্র্যাকের সহযোগিতায় রোগীর যক্ষ¥া রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ধরা পড়লে প্রথমে বাড়িতে চিকিৎসা ও পরে দ্বিতীয় ধাপে রোগীরা এ হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়। ভর্তির পরে রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসা পরবর্তী অগ্রগতি জানা সম্ভব হয় না। ফলে রোগীদের কফ, রক্ত, এমটি ও এক্স-রে করতে শহরের ক্লিনিকে বা ব্র্যাক সেন্টারে পাঠানো হয়। তিনি আরও জানান, চিকিৎসাধীন কোন রোগীর অবস্থা খারাপ হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তর করার বাহনের (অ্যাম্বুলেন্স) ব্যবস্থা নেই।’
অপরদিকে, সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া যশোর সদর উপজেলার রাজারহাট গ্রামের ওহেদ আলীর স্ত্রী হাজেরা বেগম জনান, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরে ওষুধ নিয়মিত পান। সকালে চিকিৎসক একবার রাউন্ড দেন। পরে এখানে সেবিকারা দেখাশুনা করেন। খাবার নিজেরাই তৈরি করে খান। হাসপাতাল থেকে সকালে চিড়া ও কলা দেওয়া হয়। একইকথা বললেন, মড়লি এলাকার এলাহি বক্সের ছেলে আব্দুস সাত্তার ও কেশবপুর এলাকার আছিয়া বেগম।
হাসপাতালের সেবিকা আর্জিনা খাতুন জানান, হাসপাতালে আগে নিরাপত্তা ছিলো না। এখন পুলিশের টহল ও বাউন্ডারি ওয়াল হওয়ায় পরিবেশ আগের মতো নেই।
হাসপাতালের কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান, হাসপাতালের জন্য ওয়ার্ড বয়, বাবুর্চিসহ বিভিন্ন পদে লোকবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট অবসরে যাওয়ার পরে তিন বছর থেকে সেই পদশূন্য রয়েছে। ফলে জোড়াতালি দিয়ে চলছে হাসপাতালটি। তিনি আরও জানান, যক্ষ¥াসহ ৪/৫ প্রকারের ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ নেই। কর্তৃপক্ষ এ প্রতিষ্ঠানের জনবল ও ওষুধের চাহিদা পূরণ করলে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, হাসপাতালটি ২০ শয্যার হলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় রোগী ভর্তি রয়েছে ১০জন। ২০১৮ সালে এক বছরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নিয়েছে ৭৪জন রোগী। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন জানান, হাসপাতালে বেশি রোগী আসে না। যা আসে তার সংখ্যাও অনেক কম। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন গড়ে এখানে ১০ জন রোগী থাকে। ফলে হাসপাতালের কর্মরত কর্মকর্তা- কর্মচারীদের তেমন কোনো কাজ করতে হয় না। এই সুযোগে অনেকে হাসপাতালে এসে চলে যান। রাতে ও বিকালে একজন সেবিকা ও রোগী ছাড়া কাউকে দেখা যায় না।
এ ব্যাপারে যশোরের সিভিল সার্জন দিলীপ কুমার রায় জানান, এনজিওর মাধ্যমে যক্ষ¥া রোগ নিরাময়ের সরকারি কর্মসূচি মানুষের বাড়িতে পৌঁছে গেছে। এ কারণে হাসপাতালে তেমন রোগী হয় না। এ বাদেও বক্ষ রোগের অন্যান্য চিকিৎসা জেলা সদর হাসপাতালে হয়। আবার অনেকে টিবি ক্লিনিক থেকে প্রাথমিকসেবা পায়। ফলে যক্ষ্মা হাসপাতালে রোগী কমে গেছে। তবে হাসপাতালে বিদ্যমান সমস্যার কথা স্বীকার করে তিনি জানান, যতদ্রুত সম্ভব এসব সমস্যা সমাধান করে হাসপাতালে যক্ষ্মা ও বক্ষব্যাধি রোগীদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।