এক শিল্পপতির মহৎ উদ্যোগে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষক কর্মচারী মাসিক বেতন পাচ্ছেন

ইয়াকুব আলী/ অমেদুল ইসলাম, চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি॥ যশোরের এক শিল্পপতির মহৎ উদ্যোগে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার প্রায় ৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী মাসিক বেতন পাচ্ছেন। ফলে ননএমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিত বেকার যুবকরা আশার আলো দেখছেন।
জানা যায়, ২০১৩ সালে উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ডিভাইন গ্রুপের পরিচালক শিল্পপতি রাহিন ব্যতিক্রমধর্মী পরিকল্পনা নেন।

এ সময় তিনি উপজেলার ১৩৯ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ জন শিক্ষক এবং ২৮টি ননএমপিও স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার জন্য ৩০৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেন। তাদের সাড়ে ৫হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা হারে মাসিক বেতন দেয়া হয়। ডিভাইন এডুকেশনের শিক্ষকরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়ক শিক্ষক হিসেবে পাঠদানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় ‘হোম ভিজিট’ করে থাকেন। যার মাধ্যমে এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের তথ্য পাওয়া যায়। এসব দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ (বাংলা, ইংরেজি, অংকা খাতা ও সাদা কাগজ) দেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে ২০১৪ সাল থেকে উপজেলার ননএমপিও ৬টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদেরকেও সম্মানী দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন ডিভাইন গ্রুপের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হাসানুজ্জামান রাহীন। এর আওতায় পাশাপোল আম-জামতলা মডেল কলেজের ৩২জন, জেসিবি আদর্শ কলেজের ২১, হাকিমপুর মহিলা কলেজের ২২, জেএমএসকে কলেজের ১৮, এসএম হাবিবুর রহমান পৌর কলেজের ২৬ ও তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজের ২৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে বেতন দিচ্ছে ডিভাইন গ্রুপ। এসব কলেজের প্রিন্সিপালদের সাড়ে ছয় হাজার, প্রভাষকদের সাড়ে পাঁচ হাজার, অফিস সহকারীদের চার হাজার ও অফিস সহায়কদের (পিওন) দু’ হাজার পাচশত টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়। এরপর ২০১৫ সাল থেকে উপজেলার নন এমপিওভূক্ত ২২টি স্কুল মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদেরকেও ডিভাইন এডুকেশনের আওতায় বেতন দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে হাউলী-বাড়িয়ালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০জন, পৌর আইপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১১, ঝিনাইকুন্ডু-সাদীপুর বালিকা বিদ্যালয়ের ১১, খড়িঞ্চা বালিকা বিদ্যালয়ের ৫, হিজলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯, বিপিআরএন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬, খলশী বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২, এমটিভি বালিকা বিদ্যালয়ের ১০, বিকেএইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯, পাতিবিলা নিয়ামতপুর তাহযীবুল উম্মাহ দাখিল মাদ্রাসার ১১, মাকাপুর দাখিল মাদ্রাসার ১২, বর্ণি দাখিল মাদ্রাসার ৮, শাহাজাদপুর দাখিল মাদ্রাসার ১২, জেটিকেইউ দাখিল মাদ্রাসার ১২ ও কাবিলপুর স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার ৩জন শিক্ষককে বেতন দেয়া হচ্ছে। এছাড়া এমপিওভূক্ত স্বরুদাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪জন, আরসিএমটিইউ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪, বর্ণি রামকৃষ্ণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩, উজিরপুর বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩, মাকাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩, ঝাউতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪ এবং এবিসিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪জন করে মাধ্যমিক শাখার ননএমপিও শিক্ষককে বেতন দিচ্ছে ডিভাইন গ্রুপ।

এসব স্কুলের প্রধান শিক্ষক/ সুপারদের চার হাজার, সহকারী শিক্ষকদের তিন হাজার, অফিস সহকারীদের দু’হাজার পাঁচশত এবং অফিস সহায়কদের (পিওন) ১ হাজার পাঁচশত টাকা করে সম্মানী ভাতা দেয়া হয়। এসকল শিক্ষকদের একমাসের বেতনের সমপরিমাণে বছরে দু’টি উৎসব ভাতাও দেয়া হয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভূক্তি (মানথলি পেমেন্ট অর্ডার) না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেতন দিবেন ডিভাইন গ্রুপের কর্ণধার হাসানুজ্জামান রাহীন।

এ বিষয়ে এমটিভি গালর্স স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ বলেন, এলাকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠান করেছিলাম। বেতন না হওয়ায় শিক্ষকরা সবাই চলে যাওয়ায় অবশেষে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। তবে ডিভাইন গ্রুপ বেতন দেয়ায় আবার প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষা কর্যক্রম চালু করেছি।

এ বিষয়ে আমজামতলা মডেল কলেজের অধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম বলেন,আমার কলেজটি এখনও এমপিওভূক্ত হয়নি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা কোন বেতন পায় না। তবে গত ২ বছর ধরে ডিভাইন গ্রুপ আমাদের নির্ধারিত মাসিক বেতন দেয়। এতে কিছুটা হলেও পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে। প্রতিষ্ঠান ধরে রাখার সুযোগ হয়েছে। এই বেতন না পেলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেত। এসব বিষয়ে ডিভাইন এডুকেশনের ম্যানেজার শাহিনুর রহমান শাহিন জানান এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য ডিভাইন গ্রুপ শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে। তাছাড়া ঝরে পড়া শিক্ষার্থী রোধ, বিদ্যমান শিক্ষকদের সহায়তা করা, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বেলায়েত হোসেন জানান,আমার যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক স্বল্পতা ছিল সেইসব স্কুুলে ডিভাইন গ্রুপের শিক্ষক পাওয়ায় তেমন সমস্যা হচ্ছে না। অন্যদিকে গত ৯ জানুয়ারী ডিভাইনের শিক্ষক প্রত্যাহার করা হচ্ছে বলে একটি মহল গুজব ছড়ায়। যা আদৌও ঠিক নয়। তবে সম্প্রতি, একটি বিষয় নিয়ে ওই সকল শিক্ষকদের মাঝে একটু ভূলবুঝাবুঝি হয়। ইতোমধ্যে তার অবসান হয়েছে। এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা (একাডেমিক)কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার ইভা বলেন, এটি একটি উৎসাহব্যাঞ্জক দিক। ভালো উদ্দ্যোগ। আমাদের এমন প্রতিষ্ঠানও আছে যেখানে ১৬/১৭ বছর ধরে পাঠদান করা হয়। তাদের একাডেমিক রেজাল্টও অনেক ভাল। তিনি বলেন এভাবে স্থানীয় বিত্তশালীরা এগিয়ে আসলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে মনি করি।