মণিরামপুরে এ পর্যন্ত মন্ত্রী হয়েছেন তিন জন

মোতাহার হোসেন, মণিরামপুর॥ স্বপন ভট্টাচার্য্য চাঁদ এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মধ্যে দিয়ে যশোরের মণিরামপুর থেকে এ পর্যন্ত তিন জন মন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এরমধ্যে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত এমএলএ শরৎচন্দ্র মজুমদার ১৯৫৫ সালে লবন ও আবগারি মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হন।
শরৎচন্দ্র মজুমদার
তিনি ১৮৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উপজেলার পোড়াডাঙ্গা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা দর্পনারায়ন মজুমদার চাঁচড়ার জমিদারের নায়েব ছিলেন। শরৎ মজুমদার ১৯২০ সালে মশিয়াহাটি স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তর্ণ হন। এরপর ১৯২৫ সালে ¯œাতক পাশ করেন। যশোর সদর মহাকুমার মধ্যে তিনিই নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট এবং বৃহত্তর যশোর জেলায় ওই সম্প্রদায়ের মধ্যে তৃতীয় গ্রাজুয়েট (প্রথম গ্রাজুয়েট ঝিনাইদ মহাকুমার শ্রী রসিকলাল বিশ্বাস, দ্বিতীয় মশিয়াহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নড়াইল মহাকুমার শ্রী অনন্ত কুমার বিশ্বাস)। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে শরৎচন্দ্র মজুমদার আইন সভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তিনি লবন ও আবগারি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ওই মন্ত্রী সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুর্নীতি দমন দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। মশিয়াহাটি এলাকার লেখক ও গবেষক নিত্যজিত বিশ্বাসের লেখা ‘মশিয়াহাটির ইতিবৃত্ত’ বইয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার সরেজমিন শরৎচন্দ্র মজুমদারের পৈত্রিক ভিটায় গেলে কথা হয় তার সম্পর্কে পৌত্র সহজকান্তি মজুমদারের সাথে। তিনি জানান, তার বাবা অমাল মজুমদারের বাবারা ছিলেন দুই ভাই। একজন মান্দার মজুমদার এবং আরেকজন হলেন শরৎচন্দ্র মজুমদার। শরৎচন্দ্র মজুমদার কিছুদিন উপজেলার রাজগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শরৎচন্দ্র মজুমদার স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দোগাছিয়ায় বসবাস করতে থাকেন। ওই সময় তিনি আলীপুর কোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। সেখানে তার ঠাকুরদার (শরৎচন্দ্র মজুমদার) একমাত্র পুত্র রজত মজুমদার এবং দুই মেয়ে টুকু মজুমদার ও টুনি মজুমদার আছেন। তার ঠাকুরদা সেখানেই ১৯৮৯ সালের ১৫ অক্টোবর ইহলোক ত্যাগ করেন।
মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস
তিনি ১৯৪৮ সালের ১৫ জানুয়ারি পৌর এলাকার বিজয়রামপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মৃত মোহাম্মদ ইসহাক মোড়ল ছিলেন কৃষক। স্থানীয় সুন্দলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেনি পাশ করে লাউড়ী রামনগর কামিল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে মাদরাসা বোর্ডের মেধা তালিকায় স্থান করে দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাশ করেন। ১৯৭১ সালে মাদারিপুর জেলার বাহাদুরপুর শরীয়তীয়া আলীয়া মাদরাসা থেকে প্রথম শ্রেণিতে কামিল পাশ করেন। ১৯৭২ সালে মনিরামপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইসএসসি পাশ করে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে একে এক কৃতিত্বের সাথে মওকুপ আলাইহি, দাওরায়ে হাদিস, তাকমিলে দ্বীনিয়াত ও মেধা তালিকায় ১ম স্থান অধিকার করে ইফতা পাশ করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্যকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হয়ে জাতীয়পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে প্রথমে জাতীয় সংসদের হুইপ এবং পরে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হন। বর্তমানে তিনি বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একাংশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সর্বশেষ একাদশ নির্বাচনে বিএনপি জোটের মনোনীত ধানের শীষ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
স্বপন ভট্টাচার্য্য
তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলার পাড়ালা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। বাবা স্বর্গীয় সুধীর ভট্টাচার্য্য ও মা স্বর্গীয় ঊষা রানী ভট্টাচার্য্য’র ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে মেঝ ছেলে স্বপন ভট্টাচার্য্য ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত হন।
তিনি নিজ এলাকার গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণি পাশ করে কিছিুদিন গোপালপুর স্কুলে পড়ালেখা করেন। পরে মশিয়াহাটী মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তি হয়ে এসএসসি ও এইসএসসি পাশ করেন। এরপর নওয়াপাড়া ডিগ্রী কলেজ থেকে ¯œাতক পাশ করেন। রাজনৈতিক পারিবারের সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বড় ভাই বর্তমানে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে শাহাদাৎবরণের পর তিনি গ্রেফতার হয়ে ১৯ মাস কারাভোগ করেন।
আওয়ামী লীগের দুর্দিনে এলাকার নেতাকর্মীদের পাশে এসে দাঁড়ান। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হন উপজেলা চেয়ারম্যান। সততা আর নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি স্বরূপ শ্রেষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই সময় দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মাঝে তিনি এক অনন্য ইমেজ প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। যে কারণে উপজেলা আওয়ামী লীগের বৃহৎ অংশসহ সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধে ছিলেন তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন। সেবার দলীয় মনোনয়ন না পেলেও এক পর্যায় দলের বৃহৎ অংশসহ সর্বস্তরের জনতা তাকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার জন্য প্রার্থী করেন। নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থনে এমপি তিনি নির্বাচিত হন। একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান তিনি। নির্বাচনে তিনি ১৯৮৬ সালে বড় ভাই অ্যাডভোকেট পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য’র পরাজিত হওয়ার মধুর প্রতিশোধ নেন। পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ওই নির্বাচনে মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের কাছে পরাজিত হন। পরপর তিনটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হওয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রালয়ের প্রতিমন্ত্রী মনোনীত হওয়ায় সর্বমহল থেকে উচ্চারিত হচ্ছে সত্যিই তিনি চাঁদ কপাল নিয়েই জন্ম নিয়েছেন।
কাকতালীয়ভাবে মণিরামপুর থেকে প্রথম মন্ত্রী শরৎচন্দ্র মজুমদার ও স্বপন ভট্টাচার্য্য’র বাড়ি উপজেলার পূর্বাঞ্চলে এবং তারা দু’জনেই একই স্কুলে পড়ালেখা করেছেন।

শেয়ার