স্মৃতিময় একাত্তর: মুক্তিযোদ্ধার গল্প

হেলাল উদ্দিনের লাহোর থেকে রণাঙ্গন: ফখরে আলম

হেলাল উদ্দিনের বাবা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সৈনিক ছিলেন। বাবার মত যুদ্ধবাজ হওয়ার স্বপ্নে তিনিও সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। তাকে বদলি করা হয় পশ্চিম পাকিস্থানের শিয়ালকোট ক্যান্টনমেন্টে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হেলাল লাহোরে ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রাণ পড়েছিল নিজ মাতৃভূমি পূর্ব পাকিস্থানে। দেশ স্বাধীন করার স্বপ্নে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য তিনি বিভোর হয়ে ওঠেন। লাহোরের বনভূমি নদী পার হয়ে ভারতের সীমান্তে পৌছান। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর সম্মুখেই শহীদ হন কয়েকজন সহযোদ্ধা । এরপর ভারতের অমৃতসর । তারপর কলকাতা। সেখান থেকে জেনারেল ওসমানির নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন হেলাল উদ্দিন। বর্তমানে তিনি যশোর শহরের পুরাতন কসবা এলাকায় বসবাস করছেন। লাহোর থেকে একাত্তরের রণাঙ্গনে আসার দুঃসাহাসিক কাহিনী তিনি এ প্রতিবেদককে শুনিয়েছেন।
‘১০ মে ১৯৬৮ খ্রীষ্টাব্দে কুমিল্লা গিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হই। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ছয় মাস ট্রেনিং শেষে রংপুর কেন্টনমেন্টে আমার বদলি হয়। ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান শিয়াল কোট কেন্টনমেন্টে আমাদের ৫ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে বদলি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর হতে সাগর পথে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর পাড়ি দিয়ে করাচী বন্দর পৌছাতে প্রায় ০৮ দিন সময় লাগল।
১৯৭০ এর নির্বাচনের পর কি ঘটতে যাচ্ছে তা বুঝতে পারছিলাম না।
১৯৭১ এর ২৫ মার্চ হানাদার পাকিবাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালিদের হত্যা করেছে , বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে রেখেছে এ খবরও আমরা রেডিওর মাধ্যমে বিবিসি থেকে জানতে পারি। মে মাসের মাঝামাঝি আমাদের মেজর বিএম মজ্ঞুর পরিবারসহ বর্ডারে শিকারের উদ্দেশ্যে গিয়ে ভারতে চলে যান। ঢ পরবর্তীতে বাংলাদেশে এসে আগষ্ট ১৯৭১ সালে ৮নং সেক্টর কমান্ডার হয়ে স্বশরীরে মুক্তিযুদ্ধ পআংশনেন। বি.এম মেজর মঞ্জুর সাহেব এ ভাবে শিয়ালকোট থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর আমাদের ব্যটেলিয়ন দিকে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ নজরদাড়ি শুরু করে। আমরা সবাই গোপনে ফন্দি আটতাম কিভাবে বাংলাদেশে গিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়া যায়। জুন এর শেষের দিকে আমাদের সবাই খারিয়া কেন্টনমেন্টে বদলী হয়ে আসি। আমাদের ব্যটেলিয়নের এরিয়ার পাশে প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রতিদিন লাশ নিয়ে হেলিকপ্টার আসতো । জানতে পারলাম লাশ গুলো বাংলাদেশ আক্রমনকারী পাকিস্তানী সৈনিকদের।
সেপ্টেম্বরে আবার নির্দেশ এল লাহোর এলাকায় ট্রেনিং করতে যেতে হবে। লাহোরে কিছুদিন থাকার পর আদেশ দেয়া হল লাহোর শহর থেকে প্রায় ১০ মাইল দুরে বি আর বি নালার বাঁধের উপর ডিফেন্স করার জন্য। একদিন আমরা সকলেই ঐ স্থানে পৌছালাম।
সিগারেট ও দেশলাই নিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমরা অনেকেই বুঝতে পারছিলাম যে এখান থেকে ভারত বেশী দুরে নয়।
আমরা লুকিয়ে রাখা রেডিওর মাধ্যমে গোপনে বিবিসি ও আকাশবানী কলিকাতা থেকে বাংলাদেশের সংবাদ শুনতে পেতাম। আমার একটি রেডিও ছিল । যার এন্টিনা ভাঙ্গা সেই ভাঙ্গা এন্টিনার সাথে রাইফেলের বেয়োনেট স্পর্স করিয়ে ব্যংকারে ঢুকে ভলিয়ম কমিয়ে শুনতাম।
একদিন সন্ধাবেলায় তৎক্ষনাত অর্ডার হল যে, খাওয়া দাওয়া করা যাবে না। যার যার আর্মস এমোনিশন নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরী হয়ে মুভ করতে হবে। আমি ও বদর ভাই এমজি ওয়ান এ থ্রি তাই বক্স থেকে এমোনিশন এর বেল্ট বুকে ক্রসিং করে নিলাম । মুভ হয়ে গেলে চলতে চলতে প্লাটুন হাবিলদারগন যার যার প্লাটুনের সৈন্য সংখ্যা গুনে নিত। আমরা বুঝতে পারতাম হানাদাররা আমাদের সহজে ছেড়ে দেবেনা। বাংলাদেশে যে ভাবে হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে, আমাদেরও সেভাবে মেরে ফেলবে। তবে আমাদের সৎসাহস ছিল যতক্ষন হাতে অস্ত্র থাকবে ততক্ষন আমাদের মেরে ফেলা সম্ভব হবেনা।
আমাদের দুটো কোম্পানী “এ” এবং “ডি” কোম্পানী সম্মুখে বাকি দুটো কোম্পানী পেছনে ডিফেন্সেই অবস্থান করছিল। ৩র্র্ র্ মর্টার প্লাটুন আমাদের সাথেই ছিল। আমরা চলতে চলতে তিন মাইল অতিক্রম করি। বিশ্রামের সময় প্লাটুন হাবিলদার মোজাফ্ফর ওস্তাদ (বাড়ী চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা) আমাকে ডেকে বলেন যে, হেলাল বেশী কথা না বলে আমার ওয়াটার বোতলটি খুলে দে, অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না, পানি দিয়ে পবিত্র হয়ে থাকি। আমি উনার বোতলটি খুলে দিলাম, তিনি পবিত্র হওয়ার পর আমরা আবার চলতে লাগলাম। অনেক দুর আসার পর ইঞ্জিনিয়র বেটালিয়নের সাহায্যে রাভি নদী পার হলাম। নদীটি পার হওয়ার কিছুক্ষন পর আর্টিলারীর শেলিং শুরু হয়ে গেল। আমাদের কোম্পানী কমান্ডার মেজর সাদেকুর রহমান চৌধুরী সাহেব নির্দেশ দিলেন, যার যার ম্যাগজিনে গুলি ভর্তি করে নিতে এবং একে অপরের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে তওবা করে নিয়ে অগ্রসর হতে।
প্রায় পাঁচশত গজ সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর একটি বনভূমি সামনে রেখে পজিশন নিই। সেকশন কমান্ডার আমাদের কানে কানে বলে গেলেন বনভূমি পার হওয়ার পর পরই কিছু দুরে একটি বিশাল আম বাগান সেটাই আমাদের অবজেকট সেখানেই এট্যাক করতে হবে। বনভূমি পার হয়ে পজিশনে যেতে যেতেই সম্মুখ থেকে আগুনের বৃষ্টির মত আমাদের উপর গুলিবর্ষন শুরু হয়ে গেল। আমাদের প্লাটুন হাবিলদার মোজাফ্ফর ওস্তাদের বুকে গুলি লাগে। তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। আমার বাপাশে সেকশন কমান্ডার ল্যান্স হাবিলদার আমজাদ ওস্তাদ পজিশন নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হয়ে আমার উপর দিয়ে লাফিয়ে পিছনে পড়ে গিয়ে বললেন, হেলাল রে…..আমি চলে গেলাম।
আমরাও গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে এগুতে থাকি। রাস্তা ধরে অগ্রসর হতে হতে মাইন ফিল্ড পার হয়ে আমাদের দুটি কোম্পানী অবজেকটিভে পৌছে গেলাম। ভারতের আর্মি সেখানে নেই। শুধু ব্যাংকার প্রচুর পরিমান গুলির খোসা পড়ে আছে। আমরা অবজেকটিভ পার হয়ে তিন শো গজ সামনে রি অর্গানাইজেশন শেষে যার যার পজিশনে গেলাম। মানচিত্রে দেখা গেল আমরা প্রায় সাত মাইল ভারতের ভেতরে অবস্থান করছি। সামনে মাইল তিনেক দূর অমৃতসর। । পজিশন থেকে অমৃতসরের সুউচ্চ বিল্ডিং, কল কারখানার চোঙ্গা দিয়ে ধোয়া উড়া দেখতে পেলাম। আমি ও বদর দুজন তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে আখ ক্ষেতের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে প্রায় এক মাইল যাওয়ার পর একটি গ্রামে এসে পৌছালাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি, সিপাহী নাজিম, কাঁধে অস্ত্র, নাইনটি ফোর এনার্গা ও ছোট বেলচা। ওকে আমি ধমক দিয়ে বললাম, বেলচা ফেল শুধু অস্ত্র সামলা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে অন্ধকার হলে হাবিলদার মুজিবুরের সাথের সব সৈন্য আমাদের কাছে আসে। আমরা প্রায় পয়তাল্লিশ জন সৈন্য জোট বাধি। ফাঁকা গ্রামে একজন বৃদ্ধ শিখ ভাইকে পেয়ে আমারা বাঙালি এই পরিচয় দিয়ে অনুরোধ করি, তাদের আর্মির কাছে নিয়ে যেতে। প্রায় একমাইল হেটে ইন্ডিয়ান আর্মির সাক্ষাত পেলাম। যুদ্ধ ক্ষেত্রের নিয়মেই আমাদের অস্ত্রগুলি তারা জমা নিয়ে নিল। আমরা জানতাম, ভারত সরকার আমাদের সহযোগিতা দিচ্ছে, আমরাতো সেই বাঙালি আমাদের ভয় নেই। ইন্ডয়ান আর্মির সৈন্যরা আমাদের সাথে খুবই ভাল আচরণ করলেন, তাদের কয়েকজন অফিসার এসে আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে আশ^াস দিলেন অতিসত্তর আমাদের জেনারেল ওসমানী সাহেবের কাছে কলকাতা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ডোন্টওরি, রিলাক্স, বিরাট একটি মাটির ঘর দেখিয়ে বললেন রেষ্ট করুন।
ভোর হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের সবাইকে নিয়ে গেল একটি আম বাগানে। সেখানে বড় বড় দুই টুকরি পুরি, চা আমাদের খেতে দেয়া হলো। আমি খেয়েছিলাম পনেরটি পুরি দুই মগ চা। কারণ আমি তিনদিন কিছু খাইনি। চা পুরি খাওয়া শেষে আর্মির গাড়ীতে আমাদের জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১৬৫ জনের নাম লেখা হলো। পর দিন ইন্ডিয়ান আর্মি গার্ড দিয়ে স্পেশাল ট্রেনে আমাদের কলকাতার হাওড়া ষ্টেশনে নিয়ে আসে। সেখানে থেকে আর্মির গাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয় মুক্তি যোদ্ধার প্রধান অফিসে। সেখানে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী সাহেব, শেখ কামাল ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা আমাদের স্বাগত জানালেন। আমাদের ১৬৫ জনকে ফলোইন করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় জেনারেল সাহেব আমাদের সামনে এসে কেঁদে ফেললেন। উনার কন্না দেখে আমরাও কাঁদতে লাগলাম। তিনি আমাদের সাহস জুগিয়ে যুদ্দে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন।
ক্যাম্প থেকে লুঙ্গি, জামা, সেন্ডেল সাবান ই্যসু করা হলো। পরের দিন ইন্ডিয়ান একশত রুপি বেতন হিসাবে দিয়ে কল্যানী পাঠিয়ে দিলেন। কল্যানী থেকে অস্ত্র ও একটি কম্বল নিয়ে বেনাপোল হয়ে যশোর এসে পৌছি এবং বেজপাড়া আনসারার ক্যাম্পে অবস্থান নিই। যশোর অঞ্চলে কয়েকটি শত্রু এলাকা তল্লাশি করি। একদিন গোপালগঞ্জ, কাশিয়ানি অনেক পাকিস্তানী বর্বর বাহিনি আত্ম সমর্পন না করায় ৮নং সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন মেজর মঞ্জুর সাহেবের নির্দেশে ঐ অপারেশনে যোগ দিয়ে পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পন করিয়ে ফিরে আসি। পরবর্তিতে যশোর কেন্টনমেন্টে ইন্ডিয়ান আর্মি থাকা অবস্থায় স্থানে স্থানে মাইন, গ্রেনেট, গুলি ও পাক হানাদার বাহিনীর তৈরী ব্যাংকার সার্চ করে ওসব ক্লিয়ার করে ১২ ইষ্ট বেঙ্গল গঠন করি। ’

লেখক : কবি ও সাংবাদিক,

শেয়ার