ইতিহাসের নায়ক বিমল রায় চৌধুরীর চিরবিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ তে-ভাগা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এক ইতিহাসের নায়কের নাম বিমল রায় চৌধুরী। যার হাতে যশোরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অন্তত ছয়টি স্কুল-কলেজ এবং গড়ে উঠেছে ৫৪টি মসজিদ ও আটটি মন্দির। শতাব্দীর এ নায়ক গতকাল চিরবিদায় নিয়েছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদিন অসুস্থ বিমল রায় চৌধুরী গতকাল শনিবার যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মেজো মেয়ে বনানী রায় চৌধুরী ও পৌত্র অতনু রায় চৌধুরী জানান, বার্ধক্যজনিত কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ব্রেনস্টোকে সকাল ৯টা ১০মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বিকালে মরহুমের শহরের বেজপাড়াস্থ বাসভবনে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তারপর নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে তার দাহ সম্পন্ন করা হয়।


বিয়োগান্তক খবর পেয়েই তার বাসভবনে ছুটি যান সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল, রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের অধ্যক্ষ জ্ঞানপ্রকাশনন্দ, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সাবেক মেয়র মারুফুল ইসলাম, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর জহুরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক নার্গিস বেগম, ন্যাপের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট এনামুল হক, জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা অশোক কুমার রায়, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা পূজা পরিষদের সভাপতি অসীম কুন্ডু ও সাধারণ সম্পাদক যোগেশ দত্ত প্রমুখ। এসময় সেখানে এক শোকস্তব্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
পরে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, যশোর রামকৃষ্ণ মিশন, রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, নীলগঞ্জ মহাশশ্মান, জেলা সৎসঙ্গ সংসদ, রোটারী ক্লাব অব যশোর, তির্যক যশোর, বিবর্তন যশোর, মণিরামপুর সৎসঙ্গ সংসদ, সদর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ফুল দিয়ে বিদায় জানানো হয়। এরপর সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিমল রায় চৌধুরীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক বিমল রায় চৌধুরী ১৯২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি যশোর নওয়াপাড়া বিরামপুরের বিখ্যাত রায় চৌধুরী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী জমিদার এবং একজন সমাজ সংস্কারক ছিলেন। মা অনিলা রায় চৌধুরী গ্রামের মহিলাদের সূচিশিল্পের প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনিও একজন প্রগতিশীল মহিলা ছিলেন।


বিমল রায় চৌধুরী ১৯৪২ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে কলকাতায় ক্যাম্বেল হাসপাতালে (নীল রতন সরকার মেডিকেল এ্যান্ড হাসপাতাল) এলএমএফ কোর্সে ভর্তি হন। তবে ওই বছর ৯ আগস্টের মেদিনীপুর রেভলিউশনে যোগ দিলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ আগস্ট মুক্তি পেলেও তাকে আর মেডিকেল কলেজে পড়তে দেয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে ১৯৪৩ সালে যশোর সরকারি এমএম কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৪৫ সালে আইএসসি পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। প্রস্তুতি থাকলেও পারিপার্শ্বিক কারণে তিনি এমএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পরেননি।
যশোর জিলা স্কুলে পড়াকালীন ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত হন বিমল রায় চৌধুরী। জড়িয়ে পড়েন ছাত্র ফেডারেশনে রাজনীতির সাথে। কলেজে পড়াকালীন যুক্ত হন মৎস্যজীবী ও কৃষক সমিতির সাথে। ১৯৪৫ সালে জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪৯ সালে তে-ভাগা আন্দোলনে বাঘারপাড়া ও নড়াইল অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন। একারণে তাকে পাকিস্তান সরকার গ্রেপ্তার করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কারণে আবারো গ্রেফতার করা হয় তাকে। ১৯৫৪ সালের ৩০ মে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার হন। তবে কারাগারে আন্দোলন করার অপরাধে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দুই মাস, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে তিন মাস ও কুমিল্লা কারাগারে ২ মাস রাজবন্দি হিসেবে কারাযাপন করতে হয় তাকে। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনার কিছুদিন পর মুক্তি দেওয়া হয়।
১৯৫৮ সালে সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। তবে দুই মাস পর মুক্তি পেয়ে গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রমে জড়িত থাকেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি আবারো গ্রেপ্তার করা হয় এবং কিছুদিন পর মুক্তিলাভ করেন।
১৯৬৬ সালে বিমল রায় চৌধুরী সমাজতান্ত্রিক সরকার কায়েমের শর্তে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে বোমা সরঞ্জাম সরবরাহ করেন। ২৮ মার্চ পুলিশ লাইন থেকে বাঙালি পুলিশ বের হয়ে আসে। ২৯ মার্চ যশোর জেলখানা আক্রমণ ও জেলবন্দিদের মুক্তিতে সহায়তা করেন। ওই দিন রাতে ইপিআর, পুলিশ ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের আর্মিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। ৩১ মার্চ পাক আর্মিরা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে তাদের বাড়ি আক্রমণ করে। ১৮ এপ্রিল ভারতে গিয়ে বনগাঁ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের চারটি শিবিরের দায়িত্ব নেন। ১৮ আগস্ট তিনি পলিটিক্যাল লিয়াজোঁ হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার দায়িত্ব পান। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। বিমল রায়চৌধুরী ১৯৭৪ সালে বাকশালে যুক্ত হন।
এর আগে তিনি ১৯৬৪ সালে বিডি সিস্টেমে (বেসিক ডেমোক্রেসি) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই বছরই নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন বিমল রায় চৌধুরী। ১৯৮৮ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে তিনি যশোর শিক্ষাবোর্ড ও যশোর পলিটেকনিক ইনসটিটিউট প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রতিষ্ঠা করেন বাহাদুরপুর হাইস্কুল, নবনগরী গার্লস স্কুল, তালবাড়িয়া হাইস্কুল, ঘুরুলিয়া হাইস্কুল, পাঁচবাড়িয়া গার্লস স্কুল ও মোমিননগর হাইস্কুল। এছাড়া ৫৪টি মসজিদ ও আটটি মন্দির প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা রয়েছে।
বিমল রায় চৌধুরী জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন যশোর ইনসটিটিউট পাবলিক লাইব্রেরির সহ-সভাপতি। দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিভাগের সম্পাদক হিসেবে।
এদিকে, বিমল রায় চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং যশোর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি’র প্রশাসক হুসাইন শওকত, জাসদের কার্যকরী সভাপতি ও যশোরের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম, সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার রায়, বিশিষ্ট কলামিস্ট মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলাম রন্টু, আব্দুল রাজ্জাক কলেজের অধ্যক্ষ ইকবাল হোসেন, তির্যক যশোরের সভাপতি সানোয়ার আলম খান দুলু, সাধারণ সম্পাদক আতিকুর জামান রনি, যশোর উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি অসীম কুন্ডু, সাধারণ সম্পাদক যোগেশ চন্দ্র দত্ত, সদর উপজেলা শাখার দুলাল সমাদ্দার, সাধারণ সম্পাদক দেবেন্দ্রনাথ ভাস্কর ও যশোর জেলা কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সভাপতি জামাল উদ্দিন বিলু।
যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে)
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন জেইউজে। এক বিবৃতিতে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) সভাপতি সাজেদ রহমান, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন, সহ সভাপতি প্রণব দাস, যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম রুবেল, কোষাধ্যক্ষ মারুফ কবীর, জেইউজে নির্বাহী সদস্য শফিক সায়ীদ ও জিয়াউল হক গভীর শোক প্রকাশ ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। পৃথক বিবৃতিতে শোকপ্রকাশ করেছেন বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি মনোতোষ বসু, যুগ্ম মহাসচিব সাকিরুল কবীর রিটন, সদস্য নূর ইমাম বাবুল ও গোপীনাথ দাস।
জেএসডি যশোর জেলা শাখা
শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি যশোর জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি ফকির শওকত, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ বিপ্লব আজাদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হাবিব উজ্জ্বল, সাংগঠনিক সম্পাদক এস. কে. এম তহিদুজ্জামান মনি প্রমুখ।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ যশোর শাখা
গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ যশোর জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ। বিবৃতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলা কমিটির উপদেষ্টা জোসেফ সুধীন মন্ডল, যশোর জেলা শাখার সভাপতি সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য্য, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাড. সুকুমার রায়, দিলীপ বিশ্বাস, রবীন সন্স আর, যুগ্ম সম্পাদক তপন ঘোষাল, সুবল রায়, কোষাধ্যক্ষ যোগেশ পাল, দপ্তর সম্পাদক বিকাশ চন্দ্র মন্ডল, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তিমির ঘোষ জয়, প্রচার সম্পাদক সুব্রত সরকার বাবু, সনাতন ধর্ম সংঘের সভাপতি শ্রীভূষণ ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অখিল চক্রবর্ত্তী, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক গোপীকান্ত বিশ্বাস, দপ্তর সম্পাদক বিকাশ চন্দ্র মন্ডল, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক নন্দদুলাল হালদার, ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক কামিনী রঞ্জন সাহা, সন্তোষ চক্রবর্ত্তী, বাংলাদেশ দলিত অধিকার আন্দোলন (বিডিআরএম)-এর কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও যশোর জেলা শাখার সভাপতি বিভুতোষ রায়, জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সূর্য বিশ্বাস, আইন বিষয়ক সম্পাদক দিলিপ দাস, জাগো হিন্দু পরিষদ যশোর জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সজল বিশ্বাস অসিম, ভীম চন্দ্র বিশ্বাস, দেবাশীষ মিশ্র জয় প্রমুখ। -সংবাদ বিজ্ঞপ্তি