চৌগাছায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ

বাম্পার ফলন হলেও দাম কমে হতাশ কৃষক

অমেদুল ইসলাম, চৌগাছা (যশোর)॥ যশোরের চৌগাছায় চলতি শীত মৌসুমে সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। উপজেলার প্রতিটি গ্রামে কমবেশি চাষ হয়েছে নানা ধরণের সবজি। কিন্তু হঠাৎ করে সবজির দাম কমে যাওয়ায় কৃষকের মাঝে হাতাশা নেমে এসেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে চাষিরা চরমভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন এমনটি মনে করছেন সচেতন মহল।
সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী উপজেলা চৌগাছা সব ধরণের সবজি চাষের জন্য বরাবরই বিখ্যাত। তাইতো বছরের ১২ মাসই এখানে কোন না কোন সবজির চাষ হয়। চলতি বছরও তার কোন ঘাটতি হয়নি। বিশেষ করে চলতি শীত মৌসুমে উপজেলাতে ব্যাপক ভাবে নানা ধরণের সবজির চাষ হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সবজি চাষ তুলনামুলক বেশি, ফলনও ভাল হয়েছে। এবছর চৌগাছাতে ফুলকপি ৪শ ৮০ হেক্টর, বেগুন ৭শ ৫৫ হেক্টর, বাধাকপি ৫শ ৭০ ও মুলা ৩শ ৫৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। সব মিলিয়ে এবছর উপজেলাতে ৩ হাজার ৮শ ৮০ হেক্টর জমিতে কৃষক সবজি চাষ করেছেন। সোমবার চৌগাছার প্রধান কাঁচা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চলতি শীত মৌসুমে বাজারে সব ধরণের সবজির ব্যাপক সমারোহ ঘটেছে। কাঁচা বাজারের সম্পুর্ণ এলাকায় শুধুই সবজি। কিন্তু অবিক্রি অবস্থায় সব চাষিরা চাতক পাখির মত ব্যাপারীদের মুখের দিকে চেয়ে আছেন। দিন শেষে তারা পানির দরে এসব সবজি বিক্রি করে বাড়ি ফিরছেন। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শীতের সবজির মধ্যে ফুলকপির সমারোহ সব থেকে বেশি। যে ফুলকপি গত শীত মৌসুমের এই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা মণ, সেই কপি এবার বিক্রি হচ্ছে ২শ থেকে ২শ ২০ টাকা মণ।.কথা হয় উপজেলার হোগলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক পিন্টু মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ১ বিঘা কপি চাষ করতে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। অনেক আশা নিয়ে কপি চাষ করেছিলাম। কিন্তু এখন সব আশা যেন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। বর্তমান বাজার দরে তার ক্ষেতের সমুদয় কপি বিক্রি করলে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ঘরে আসবে। এই ক্ষতি কিভাবে তিনি কাটিয়ে উঠবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। চুয়াডাগাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার করচাডাঙ্গা গ্রামের কৃষক ছমির উদ্দিন বলেন, তিনি চলতি মৌসুমে সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে ফুল কপির চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত ওই কৃষকের খরচ হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। বর্তমানে কপি উঠার ভরা মৌসুম। চৌগাছা বাজারে সবজির দাম ভাল তাই তিনি এই বাজারে সবজি নিয়ে আসেন। কিন্তু এবছর কপির যে দাম তাতে লাভ তো দুরের কথা খরচের টাকা উঠাও এখন কষ্ট হয়ে যাবে। কৃষক তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, তিনি দেড় বিঘা জমিতে ফুলকপি ও ১ বিঘা জমিতে বাঁধা কপির চাষ করেছিলেন। কিন্তু বাজার দরে তিনি নিঃস্ব হয়ে যাবেন বলে আশংকা করছেন। একই কথা বলেন কৃষক জিল্লুর রহমান, জামাত আলী, সেলিম রেজা, মুকুট হোসেন, কবির উদ্দিন প্রমুখ। এদিকে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সোমবার চৌগাছা প্রধান কাঁচা বাজারে পাইকারী ১ কেজি ফুলকপি ৫ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০ টাকা, বেগুন ৮ টাকা, সিম ৭ টাকা, পেঁপে ৬ টাকা, নতুন পিয়াজ ১৩ টাকা, বরবটি ১০ টাকা, বাঁধাকপি ৪ থেকে ৫ টাকা, পটোল ৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে আর পালনশাক ৩ টাকা আটি, লাউ প্রতিটি ১০ থেকে ১২ টাকা, লাল শাক ৩ টাকা আটি বিক্রি হচ্ছে। শীতের ভরা মৌসুমে এক প্রকার আকস্মিক ভাবে সবজি বাজারে এমন ধ্বংশ নামাতে কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা নেমে এসেছে। চৌগাছা কাঁচা বাজারে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে আড়তের ব্যবসা করে আসা ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, আমার দীর্ঘ ব্যবসায়ী বয়সে বাজারের এমন দরপতন তিনি দেখেনি। কৃষক দীর্ঘ একটি বছরের পরিশ্রম শেষে যখন তার ফল ঘরে তুলতে যাবে তখনই সে ধরাশায়ী হচ্ছে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলাতে প্রচুর পরিমাণে সবজির চাষ হয়েছে। চাহিদার থেকে উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের এমন কোন জেলা নেই যে, সেখান থেকে ব্যাপারীরা এখানে ছুঁটে আসে না। এবছরও তার কোন ঘাটতি হয়নি। কিন্তু বাজারে সবজির দাম নেই। দেশের কোন এক প্রান্তে সবজির দাম কম হলেই তা মুহুর্তের মধ্যে ব্যাপারীরা জেনে যাচ্ছে, বিধায় তারাও কম দামে সবজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচউদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে সবজির চাষ তুলনামুলক বেশি হওয়ায় সবজির দাম কিছুটা কম। তবে এই অবস্থার দ্রুতই উন্নতি ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।

শেয়ার