নারকেলের আবর্জনা থেকে তৈরি পণ্য রফতানি করে যখন কোটি টাকা আয়

মোহা. কামরুজ্জামান, বাগেরহাট॥ নারকেলের ছোবড়া একসময় আবর্জনা হিসাবে এখানে সেখানে ফেলে দেয়া হতো, পড়ে থেকে পচে নষ্ট হতো, কেউ আবার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেই আবর্জনা থেকে প্রক্রিয়াজাত করে তার থেকে তৈরি করা নানা পণ্য রফতানি করে আয় করছে কোটি টাক। এই নারকেলের ছোবড়া এখন আর ফেলনা আবর্জনা নয়, এই কাচাঁ মাল দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটাতে এবং অর্থ উপর্জনে অগ্রণী ভুমিকা রেখেছে। নারকেলের ছোবড়ার তৈরি পণ্য আমাদের কাছে বেশী একটা পছন্দের না হলেও চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডসহ পাশ্চত্যে বেশ সমাদৃত হয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রপ্তানি করে স্বাবলম্বি হচ্ছে শতশত বেকার যুবক। এরফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
নারকেলের ছোবড়া (কাচাঁমাল) প্রক্রিয়াজাতকরণে স্থাপিত হয়েছে বাগেরহাটে শতাধিক কারখানা। যেগুলোতে ছোবড়া প্রকৃয়াজাত করণের পর তৈরি হচ্ছে বিছানার জাজিম, দড়ি, যানবাহনের আসন, মাদুর ও শৌখিন জিনিসপত্র। আর এসব রফতানি হচ্ছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশে। নারকেলের ছোবড়া প্রক্রিয়াজাত করণের বাণিজ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন বাগেরহাটের মোস্তাফিজ আহমেদ। তার কারখানায় তৈরি পণ্যে বৈচিত্র্য বেশি হওয়ায় বিদেশে চাহিদা বেশি। এখন পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাবে চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। তার দেয়া তথ্যমতে, গত ১৫ বছরে এ কারখানায় উৎপাদিত প্রায় পাঁচ হাজার টন পণ্য বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়েছে। ন্যাচারাল ফাইবার নামে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু ২০০৫ সালে। তখন বাগেরহাট বিসিক নগরীতে পরীক্ষা মূলক ভাবে এবং ২০০৭ সালে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্য অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে ম্যাট, পাপোশ, কয়ের টেপ, উইড কন্ট্রোল ম্যাট, কয়ের শিট, কয়ের পট, হ্যাংগিং বাসকেট, লিনার বাসকেট, কয়ের ফিল্ট, সিড জার্মিনেশন পট অন্যতম। কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে মোস্তাফিজ আহমেদ জানান, স্থানীয় বাজার ও নারকেল তেলের মিল থেকে ছোবড়া সংগ্রহ করা হয়। এরপর মেশিনে ছোবড়া থেকে আঁশ আলাদা করা হয়। আঁশ আলাদা করার সময় উপজাত হিসেবে যে ডাস্ট তৈরি হয়, তা প্রক্রিয়াজাত করে রফতানি করা হয় প্রতি টন ১৫০ থেকে ২৫০ ডলারে। এগুলোকে বলে কয়ার ফিট। ইউরোপসহ শীত প্রধান দেশে কৃষিকাজ এবং গবাদিপশু পালনে এটি ব্যবহার হয়। নিজের প্রতিষ্ঠিত ন্যাচারাল ফাইবার কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আছেন মোস্তাফিজ আহমেদ। এ ব্যবসার ধারণা কীভাবে মাথায় এল, সেই গল্পের বর্ণনায় বলেন, আগে নারকেল তেলের ব্যবসা করতেন। তখন দেখতেন বর্ষায় তেল মিল মালিকরা ছোবড়া নিয়ে খুব বিপাকে পড়তেন। কারণ ছোবড়ার একমাত্র ব্যবহার ছিল জ্বালানি। তখন তিনি এই ছোবড়া নিয়ে ভাবতে থাকেন। ২০০৫ সালে নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি মেশিন নিয়ে শুরু করেন কারখানা। প্রথম দিকে ম্যাট, পাপোশ, জাজিম, মাদুরসহ কয়েকটি পণ্য শুধু দেশে বাজারজাত করেন। পরে বিদেশেও বাজার খুঁজে নেন। এখন দুটি কারখানায় ছোবড়া থেকে নানা পণ্য তৈরি হচ্ছে। কাজ করছেন শতাধিক শ্রমিক। ব্যবসার আকার সম্পর্কে জানতে চাইলে বিস্তারিত তথ্য দিতে কিছুটা অনীহা প্রকাশ করেন এ উদ্যোক্তা। তার পরও জানান, এ কারখানা থেকে ১৫ বছরে ২ হাজার ৭৫০ টন পণ্য সরাসরি রফতানি হয়েছে। এর পাশাপাশি রফতানিকারকদের চাহিদা ও ডিজাইন অনুযায়ী ২ হাজার ২ টন পণ্য তৈরি করে দিয়েছেন তিনি, যার শতভাগই রফতানি হয়েছে। তবে সরকারি কিছু নীতির কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়ছেন বলে উল্লেখ করেন মোস্তাফিজ আহমেদ। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী ভারত ও শ্রীলংকায় এ ধরনের অনেক কারখানা আছে। ছোবড়ার পণ্য রফতানি করে ভারত বছরে ১৪ কোটি ডলার আর শ্রীলংকা ৬-৭ কোটি ডলার আয় করে। এই দুই দেশের সরকার উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দেয়। তারা করমুক্ত ব্যবসা করে। এছাড়া কৃষিজ পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে উদ্ভিদ সংগনিরোধ সনদের মাশুল নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এ উদ্যোক্তা। এ মাশুল ভারত ও শ্রীলংকা থেকে কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

SHARE