চৌগাছায় আগাম চাষে বাম্পার ফলন হলেও লোকসানের শঙ্কায় কৃষক

অমেদুল ইসলাম, চৌগাছা (যশোর) থেকে॥ যশোরের চৌগাছায় চলতি মৌসুমে অধিকাংশ কৃষক বাধা কপির চাষ করে লাভবান হচ্ছে। বেশি লাভের আশায় এখানকার কৃষকরা শীত মৌসুম আসার আগে ভাগে বাধা কপির চাষ শুরু করেন। এখন কপি উঠার উপযুক্ত সময়। কিন্তু বাজারে হঠাৎ করেই কপির দাম কমে যাওয়ায় খরচের টাকা ওঠা নিয়ে শংকায় রয়েছেন কৃষকরা। সম্প্রতি দুই দিনের পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে বাজার দর অনেকাংশে কমে গেছে। বর্তমান বাজার দরের পরিবর্তন না ঘটলে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হতে পারেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী উপজেলা চৌগাছা সব ধরণের সবজি চাষের জন্য বরাবরই বিখ্যাত। এ জনপদের চাষিরা যুগযুগ ধরে নানা ধরণের সবজি চাষ করে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, এমন নজির রয়েছে। নতুন নতুন চাষাবাদে কৃষক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন, এমন ঘটনাও কম না। এরআগে চৌগাছা অঞ্চলের কৃষক সিম, বরবটি, লালশাক, পালনশাক, বেগুন, টমেটোর চাষ করলেও কপি চাষে তারা বেশ পিছিয়ে ছিলেন। গত কয়েক বছর ধরে কৃষক বাধা কপি ও ফুল কপির চাষ করে বেশ সাফল্য অর্জন করেছেন। তাদের সফল্য দেখে এখন উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের কৃষক ব্যাপক ভাবে কপি চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু চলতি মৌসুমের শুরুতে কপির যে বাজার দর, তাতে করে খরচের টাকা ওঠা কষ্টসাধ্য হবে, এমনটিই জানালেন কৃষক সোহেল রানা। শনিবার উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের বিভন্ন গ্রামাঞ্চলের মাঠে যেয়ে দেখা যায়, কৃষক তাদের সবজি ক্ষেতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ সময় কথা হয় হাজরাখানা গ্রামের লিয়াকত আলীর ছেলে কৃষক সোহেল রানার সাথে। তিনি জানান, চলতি শীত মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে বাধা কপি ও ১ বিঘা জমিতে ফুল কপির চাষ করেছেন। মাত্র তিন মাসের সবজি হচ্ছে বাধা কপি। এবছর কপির চারা রোপনের পর অতিমাত্রায় তাপ থাকায় কপির চারা সেভাবে বেড়ে উঠতে পারেনি। তাই কিছুটা দেরিতে চলতি মৌসুমে কপি উঠা শুরু করেছে। কিন্তু শুরুতেই বাজার দরে চরম ধস নেমে আসায় তিনি লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন। বর্তমানে এক মন কপি বাজারে তারা বিক্রি করছেন ৪শ’ থেকে ৪২০ টাকায়। আর প্রতি পিচ কপি বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬ টাকা দরে। মৌসুম শুরুর কয়েক দিন বাজার দর কিছুটা ভাল ছিল কিন্তু হঠাৎ করে দাম নিন্মমুখী। এর কারণ হিসাবে তিনি জানান, সম্প্রতি পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা দুই দিন ধর্মঘট হয়েছে। এই অজুহাতে ব্যাপারীরা কপির দাম বহুলাংশে কমিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপরীরা তাদের কাছ থেকে কম দামে ক্রয় করে তা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকাতে নিয়ে উচ্চদরে বিক্রি করছেন। তিনি জানান, মধ্যস্বত্ত্ব ভোগীদের দৌরাত্বের কারণে কৃষক তার পণ্যের কাংখিত মুল্য থেকে বরাবরই বঞ্চিত হয়ে আসছেন। সোহেল রানার মত হাজরাখানা, টেংগুরপুর, আন্দারকোটা, পেটভরা, গুয়াতলী, ইছাপুর, পাঁচনামনা গ্রামের অসংখ্য কৃষকের সাথে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাঁচনামানা গ্রামের কৃষক ওয়াজেদ আলী বলেন, ১ বিঘা জমিতে কপি চাষ করতে যেয়ে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যদি কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু ক্ষেতে সবজির ব্যাপক ফলন হয়েছে, সেই সবজি যদি বাজারে নিয়ে পানির দরে বিক্রি করা হয় তাহলে কোন কৃষকই তা সহজে মেনে নিতে পারে না। তিনি বলেন, আমার ক্ষেতের উৎপাদিত কপি আমি পাইকারি বাজারে ৬ টাকা দরে বিক্রি করছি, সেই কপি ২শ গজ দুরে যেয়ে খুচরা বাজারে তা ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মুলত কৃষকের হাত থেকে যখন অন্য হাতে চলে যায় তখনই সেই পণ্যের দাম কয়েক গুন বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের অনেক কৃষক রাগে ক্ষোভে শীতের অন্যতম একটি সবজি মুলার ভাল বাজার দর না পেয়ে বাজারের খালি জায়গায় তা ফেলে রেখে চলে গেছেন। অনেকে জমিতেই সব মুলা নষ্ট করে দিয়েছেন। মৌসুমের শুরুতেই বাজারের এই বেহালদশার কারণে হতাশা দেখা দিয়েছে চাষিদের মধ্যে। কৃষক তার উৎপাদিত প্রতিটি পন্যের ন্যায্য মুল্য নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ঠদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাইচউদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলাতে ৩৫০ হেক্টর জমিতে বাধা কপি আর ১৫০ হেক্টর জমিতে ফুল কপির চাষ হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। আবহাওয়া কপি চাষের অনুকুলে থাকায় ফলনও ভাল হয়েছে। অন্য বছরের তুলনায় এবছর বাজার দর কিছুটা কম, তবে দামের পরিবর্তন ঘটবে বলে তিনি মনে করছেন।

SHARE