আয়োজনে যশোরের মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার যোদ্ধার মুখে ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’র ধারাবিবরণী শুনে মুগ্ধ প্রজন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ঘরের মেঝেতে বসা জনা বিশেক আগ্রহী তরুণ শিক্ষর্থী। পাশাপাশি বসা উত্তাল একাত্তরের দুই বীর সেনা। তাদেরই একজন স্মৃতির ডানা মেলে স্বদল নিয়ে উড়াল দিলেন অতীতে। ধারাবিবরণীতে উঠে এলো বাঙালির বীরত্বগাথা। যা মস্তিষ্কের রাডারে ধরা পড়তেই কখনো অসীম উন্মাদনা আবার কখনো সীমাহীন উদ্বেগ ফুটে উঠে তরুণদের চোখে মুখে।
একাত্তরের রক্তাক্ত সময়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রতিটি প্রান্তে নানা কায়দায়, নানা ধরনে হানাদারদের সাথে যুদ্ধ হয়েছে। যে যুদ্ধের রেস দেশের সীমানা পেরিয়ে গেছে সময়ের ব্যবধানে। যা যুদ্ধকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে দ্রুততার সাথে। তেমনি এক লড়াই ‘বিশ^ বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’। কোলকাতা-দিল্লীর সেই ঐতিহাসিক যাত্রায় অংশ নেন মুক্তিপাগল ৩৮ বাঙালি যুবক। যাদের একজন মুক্তিযোদ্ধা অহেদুজ্জামান চাকলাদার মুকুট।
যশোরে সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ‘এসো মুক্তিযোদ্ধা দেখি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনি’ শিরোনামে এই মহতি অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। যেখানে সরাসরি যোদ্ধার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাস্তবতা-হানাদার আর রাজাকারদের নৃশংসতা যেমন তুলে ধরা হয়, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরোচিত কর্মতৎপরতাও ফুটে ওঠে। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি নিশাত সুবাহর সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও পাঠাগারের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রবীণ সাংবাদিক রুকুনউদ্দৌল্লাহ।
মুক্তিযোদ্ধা অহেদুজ্জামান চাকলাদার মুকুট বলেন, ‘২৫ মার্চের পাকিস্তান বাহিনীর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পরদিন আমি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাই। বনগাঁয় কিছু পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হয়। পরে দেখা হয় আওয়ামী লীগ নেতা তবিবর রহমান সরদার, হাদিউজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন নেতার সাথে। পরে আমি কোলকাতায় চলে যাই। কিছুদিন পর আবার দেশে চলে আসি। সীমান্ত পেরোনোর পরপরই পথিমধ্যে আমাকে বার বার বিপদের মুখে পড়তে হয়। কখনো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আবার কখনো এদেশের রাজাকাররা আমার পথ রোধ করে। রাজাকার বাহিনীর অন্যের বাড়িতে লুট করতে দেখি। ভারতে পালানোর সময় তারা হিন্দু নারীদের পথ আগলে দাঁড়ায়। শিশুদের আছড়ে হত্যা করে। মণিরামপুরের মেহের জল্লাদ নামে এক রাজাকার জয় বাংলার পক্ষে থাকার দায়ে একজনের শরীরের চামড়া খুলে নেয়। এসব দেখে আমি ফের ভারতে পাড়ি দিই।’
‘সেখানে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভলান্টারি সার্ভিস কোরে যোগ দিই। আমরা শরণার্থীদের নানা ধরণের সেবায় কাজ করতাম। পরে বিশ্বজনমত গঠনে কোলকাতা-দিল্লী পদযাত্রায় যোগ দিই।’
‘ঠিক হলো পদযাত্রার মাধ্যমে কলকাতা থেকে দিল্লী গিয়ে ভারতীয় সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায় এবং সেখানে অবস্থানরত বিভিন্ন দূতাবাসে স্মারকলিপি ও বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা হবে।
‘১৪ অক্টোবর কলকাতা থেকে শুরু হলো আমাদের পদযাত্রা। যাত্রাপথে আমরা প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার হেটেছি। পরে যাত্রাবিরতিতে স্থানীয়দের মধ্যে আমাদের বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরেছি। তারা আমাদের অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে। বহরমপুরের একটি স্কুলে রাত্রিযাপন করি। সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। তদের কেউ কেউ হাত কেটে রক্ত দিয়ে আমাদের কপালে রক্ততিলক পরিয়ে দিল।’
‘কানপুর হয়ে আমরা লক্ষেèৗর দিকে এগোতে থাকি। পথে ১৬ ডিসেম্বর জানতে পারি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। পরে লক্ষেèৗতে আমাদের ৩৮ জনকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। লক্ষেèৗ স্টেডিয়ামে ছয় ফুটের বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি তৈরি হয়। সেখানে ফুলের মালা দেওয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর সেদিন লক্ষেèৗবাসীও বিজয় উৎসব করে। পরে আমরা দেশে ফিরে আসি। তবে সেই ৩৮ জনের মাত্র ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। বাকিরা রয়ে গেছেন অবহেলিত।’
সমাপনী বক্তব্যে নিশাত সুবাহ বলেন, ‘আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের কাছ থেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে পেরে কৃতজ্ঞ। এই ধারা অব্যাহত থাকবে। যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।’
ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান রুকুনউদ্দৌলাহ জানান, প্রতিমাসে এ ধরনের দুটি অনুষ্ঠান করা হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের গল্পগুলো লিপিবদ্ধ করে পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। এ অনুষ্ঠানে আইইডি পরিচালিত যুব ফোরামের ৮ জন তরুণসহ এম এম কলেজের ২০ জন ছাত্রী অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জনউদ্যোগ আহবায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমেদ, আইইডি ব্যবস্থাপক বীথিকা সরকার।

SHARE