চলে গেলেন ফুটবলার তৈরির কারিগর ওয়াজেদ গাজী

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ফুটবলার তৈরির কারিগর জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ ওয়াজেদ গাজী (৮৮) আর নেই (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে যশোর শহরের ওয়াপদা রোডে মেয়ে শাহানা ইয়াসমিনের বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুতে ক্রীড়াঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওয়াজেদ গাজীর আদি নিবাস সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়ীয়া গ্রামে। ১৯৬৩ সালে থেকে তিনি যশোরের বাসিন্দা। শেষ জীবনে তিনি মেয়ের বাসায় থাকতেন। মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়ে, দুই ছেলে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্যা গুণাগ্রাহী রেখে গেছেন। তার স্ত্রী ২০১৫ সালের ২ জুন মারা যান। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন ওয়াজেদ গাজীর নাতি তারিফ হাসান।
বাদ যোহর যশোর ঈদগাহে অনুষ্ঠিত নামাজের জানাজায় যশোরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, ক্রীড়া সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে শামস্ উল হুদা স্টেডিয়ামের আমেনা খাতুন ক্রিকেট গ্যালারিতে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। মরহুমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, শামস্ উল হুদা ফুটবল অ্যাকাডেমি, ফুটবল খেলোয়াড়বৃন্দ, যশোর সোনালী অতীত ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি যশোর জেলা শাখা, যশোর স্থানীয় ক্রীড়া রিপোর্টারবৃন্দ। যশোর শহরের কারবালা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
ওয়াজেদ গাজীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার, জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরি সভাপতি মুক্তিযোদ্ধ অ্যাড. রবিউল আলম, জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা অশোক কুমার রায়, যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফিকুজ্জামান, ইয়াকুব কবীর, অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক মকসেদ শফী, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসাদুজামান মিঠু, যুগ্ম সম্পাদক নুরুল আরিফিন, সদর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এসএম মাহমুদ হাসান বিপু প্রমুখ।
ওয়াজেদ গাজীর বর্ণাঢ্য জীবন:
১৯৫৮ সালে স্পোর্টিং ইউনিয়নের হয়ে কলকাতা লীগে অভিষেক হয় ছোট্ট এক কিশোরের। ১৯৬৩ সালে কলকাতা মোহামেডানে খেলেছিলেন। তারপর ফিরে আসেন দেশে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিজি প্রেসে প্রথম নাম লেখান। তারপর ওয়ান্ডারার্স, ইপিআইডিসি (পরে বিজেএমসি), মোহামেডানে খেলে ’৭৬-এ ফিরে আসেন ওয়ান্ডারার্সে। পাঁচবার ছিলেন ঢাকা লীগ চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য। তবে ’৭৭ সালে ঢাকার মাঠ ছাড়লেও যশোর জেলা দলের হয়ে খেলেছেন আশির দশকের শেষ অবধি। ১৯৭৮ সালে কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ হয় তার। তখন যশোর ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন ইউনিট টিমকে অনুশীলন করান। রহমতগঞ্জের মোহাম্মদ আমিন ওয়াজেদ গাজীর জীবনের বাঁক বদলে দেন। রহমতগঞ্জের কোচের দায়িত্ব নিয়ে ’৮৩ পর্যন্ত কাটিয়ে দেন। পরের দু’মৌসুম ছিলেন আরামবাগে। ১৯৮৬ থেকে ’৮৮ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার কোচ ছিলেন। ১৯৮৭ সালে জাতীয় দলের কোচও হয়েছিলেন স্বল্প সময়ের জন্য। পরের বছর তার ঠিকানা হয় ফরাশগঞ্জে। ১৯৯০ সালে আরামবাগে ফিরেন। ’৯৬ থেকে ২০০২ পর্যন্ত ছিলেন আরামবাগের কোচ। দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারের প্রায় অর্ধেকটাই আরামবাগে কাটানোর পর ২০০৩ সালে যোগ দেন শেখ রাসেলে। তারপর ব্রাদার্স, বিজেএমসি হয়ে আবারও আরামবাগের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ওস্তাদ ওয়াজেদ গাজী। ৬০ বছর কাটিয়েছিলেন ক্লাব পাড়ায়।
শেষ জীবনে কষ্টেই ছিলেন ওস্তাদ
ফুটবলার হিসেবে মাঠ কাঁপিয়েছেন দীর্ঘদিন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ফুটবলার তৈরির দক্ষ কারিগর হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার প্রাণে মিশে ছিল ফুটবলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেই মানুষটি শেষ জীবনে দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছেন। আরামবাগের কোচ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালের মে মাসের শুরতে ব্রেন স্টোকে আক্রান্ত হন। তিনি এরপর চিকিৎসা শেষে তার স্থান হয়েছে মেয়ের বাড়িতে। দুই ছেলে থাকলেও তাদের কাছে জায়গা হয়নি তার। যশোর শহরের ওয়াপদা পাড়ায় মেয়ে শাহানা ইয়াসমিনের বাসায় বসবাস করছিলেন ওয়াজেদ গাজী। তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এগিয়ে আসেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর। এককালীন সহযোগিতাও করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি বদলি হলে, আর সহায়তা পাননি। পরবর্তীতে আরও কিছু গণমাধ্যমে অসুস্থতার সংবাদ প্রকাশের পর কয়েকটি সংগঠন পাশে দাঁড়ায়।

শেয়ার