নতুন বছরে ঘুরে দাঁড়াতে চায় কালীগঞ্জের মৃৎ শিল্পীরা

নয়ন খন্দকার, কালীগঞ্জ॥ এক সময় গ্রামে গ্রামে এমনকি শহরে ঝুড়িতে ফেরি করে মাটির তৈরী জিনিসপত্র বিক্রি করা হতো। এখন এ দৃশ্য কালে ভদ্রেও চোখে পড়ে না। গ্রামের হাট বাজারে এখন আর দেখা যায় না আলাদা করে মাটির জিনিস বিক্রির দৃশ্য। মাটির হাঁড়িতে রান্না, মাটির সানকিতে খাওয়া, পানি রাখতে মাটির কলস, গ্রাম বাংলায় ধান ভিজাতে মাটির কোলার ব্যবহারও খুব একটা দেখা যায় না। সভ্যতার উৎকর্ষ ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় পাল্টেছে তৈজসপত্রের ধরণ। এখন ব্যবহৃত হচ্ছে নানাবিধ ধাতব পদার্থের তৈজসপত্র। অথচ এক সময় ছিল; কি শহর কি গ্রাম প্রতিটি বাড়িতে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ছাড়া যেন কল্পনাও করা যেত না। এখনকার মানুষ মাটির তৈরী এসব জিনিসপত্রকে সেকেলে ভেবে থাকে। তাই আমাদের মৃৎ শিল্প এখন মৃতপ্রায়। অনেক কুমার পরিবার পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে চলে গেছে অন্য পেশায়। কিন্তু এখনও এ শিল্পকে আঁকড়ে আছেন পোড় খাওয়া স্বল্প সংখ্যক শিল্পী যারা পূর্বপুরুষের শেখানো কাজের ওপর মেধা ও শ্রম দিয়ে আধুনিক তৈজসপত্রের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন মৃতপ্রায় এ শিল্পটিকে। মন্টুগোপাল পাল তাদের একজন। মৃৎ শিল্পী মন্টুগোপাল পাল ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার শিবনগরের বাসিন্দা। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আছেন এ পেশায়। তিনি জানান, পূর্বে কুমার পরিবারের সদস্যরা মাটির তৈরী গুড়, রসের ভাড়, হাড়ি, সরা, পানের বাটা, কলস, কোলা, চাড়ি, দইয়ের ভাড়, পিঠা বানানোর ছাঁচ, ব্যাংকসহ বিভিন্ন রকমের খেলনা তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতো। বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভাড়ের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। হাড়ি সরা কলস কোলার ব্যবহার পূর্বের মতো নেই। দই রাখার জন্য মাটির ভাড়ের পরিবর্তে সিলভারের পাত্র ব্যবহৃত হওয়ায় তার চাহিদাও কমছে প্রতিদিন। এ কারণে কুমার পরিবারের অনেক সদস্য পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে এখন অন্য পেশায় গেছেন।
বিমল জানান, ইতিমধ্যে শুধুমাত্র শিবনগরেই প্রায় ২০ টি পরিবার এই পেশা ছেড়েছেন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্প। বিলুপ্ত প্রায় এই শিল্পটিকে কালীগঞ্জের শিবনগর, সিংঙ্গী, গোমরাইল, অনুপমপুর, শ্রীরামপুর, বালিয়াডাঙ্গার প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি পরিবরার টিকিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু আর কত দিন তাদের পক্ষে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। অবশ্য মৃৎ শিল্পী তপন পাল, কনক পাল, চৈতান্য পাল কিছুটা আশার বাণী শুনিয়েছেন। তারা জানান, হঠাৎ করেই স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরী বৃদ্ধি পাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে কুয়ার পাটাতনের। পায়খানার হাউজ তৈরীতে এ পাটাতন ব্যবহৃত হচ্ছে। সিমেন্টের তৈরী রিং স্লাবের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় পাটাতনের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এখন আবার ঘুরে দাড়ানোর সাহস হয়েছে তাদের।
মৃৎ শিল্পীদের আঙিনা ঘুরে এবং তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় শিল্প নির্মাণ কৌশল। পার্শ্ববর্তী মাঠ থেকে এঁটেল মাটি এনে কাদা বানিয়ে সেই কাদা দিয়ে কুয়ার পাটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র বানান তারা। পরিবারের মেয়েরা ছাঁচের গায়ে কাদা লাগিয়ে পাট তৈরী করেন। এছাড়াও মাটির ভাড় মাটির ব্যাংকের দুটি অংশের জোড়া দিয়ে মসৃন করার জন্য কাদার প্রলেপ দেন মহিলারা। পরে রোদে শুকিয়ে সেগুলোকে সাজানো হয় পুশেলে। একটি পুশেলে একবারে ৫০ থেকে ৬০ টি পাট ও ১৫ থেকে ১৬টি চাড়ি বসানো যায়। এক পুশেল পাট পোড়াতে জ্বালানি খরচ হয় ১ হাজার থেকে ১২ শত টাকা। পোড়ানো প্রতিটি পাট ৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়। যা তৈরীর পরিশ্রম ও খরচের তুলনায় লভ্যাংশ অনেক কম হলেও বেশি চাহিদার কারণে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্ত কালের আর্বতে যদি পাটের চাহিদাও কমতে থাকে তবে অচিরেই বিলুপ্ত হতে পারে এ শিল্প এমনটি আশঙ্কা কুমার পরিবারের। বর্তমানে মানিকগঞ্জ, সাভার, নড়াইল বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরী মাটির তৈরী বাহারী সৌখিন জিনিসপত্রের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। শহুরে পরিবারে, অফিস, রেস্তারায় রঙ তুলির ব্যবহার করা মাটির তৈরী জিনিস শোপিস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এবং এতে ভালো মুনাফাও পাওয়া যায় বলে জানতে পেরেছেন এ অঞ্চলের মৃৎ শিল্পিরা। কিন্তু রঙ তুলি দিয়ে বাহারী জিনিসপত্র কিভাবে তৈরী করতে হয় সে কৌশল জানা নেই তাদের। কালীগঞ্জের মৃৎ শিল্পীরাও চায় সেকেলে প্রযুক্তি বাদ দিয়ে মানিকগঞ্জ, সাভাররের কুমারদের মতো মাটির জিনিসপত্রে শৈল্পিক রূপ দিতে। এজন্য কালীগঞ্জের মৃৎ শিল্পীরা সরকারি বা বেসরকারিভাবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানান। অন্যদিকে শিল্পপ্রেমীরা চান কোন ভাবেই যাতে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎ শিল্প কালের আর্বতে হারিয়ে না যায়। তাই মৃৎশিল্প রক্ষার্থে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।

শেয়ার