উন্নত দেশ গড়তে নৌকায় ভোট চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

দেবু মল্লিক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা রুখতে পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে তাদের বলেছিলাম এই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন না। কারণ আমি জানতাম এখানে দুর্নীতি হয়নি। আমি বলেছিলাম আমরা নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু করবো। তা আমি করে দেখিয়েছি। আমরা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কোন অপশক্তির কাছে নত নয়, বিশ্ব দরবারে আমরা মাথা উঁচু করে থাকবো। এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হবে। আগামী ২০২১ সালে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদ্যাপন করবো। সেই সময় বাংলাদেশে কোন দারিদ্র্য থাকবে না।’
গতকাল যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে যশোর জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জনসভাস্থল থেকে প্রধানমন্ত্রী যশোরের ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একই সাথে তিনি যশোরের কপোতাক্ষ ও ভবদহ সমস্যার সমাধান করা হবে বলে ঘোষণা দেন। এসময় তিনি দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আগামীতে আবারো নৌকা মার্কায় ভোট চান।


জিয়াউর রহমানের অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল ও তার পরিবারের আর্থিক দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে এদেশের ক্ষমতা দখল করে। তারা ক্ষমতায় এসে এদেশের হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। ২১ বছর ধরে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের উপর নির্যাতন চালায়। যারা এদেশের মা বোনদের পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিয়েছিলো সেই রাজাকারদের রাজনীতি করার অধিকার দেওয়ার পাশাপাশি চাকরি দিয়ে বিদেশে পাঠায় দেয় জিয়াউর রহমান। আর সেই যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে দেয় বেগম জিয়া। এই পরিবারের উদ্দেশ্য এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, তাদের উদ্দেশ্য লুটপাট করে সম্পদশালী হওয়া। তাদের এক ছেলে আমেরিকায় অর্থপাচার করে ধরা খেয়েছে। হাওয়া ভবন খুলে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে তা বিদেশে পাচার করেছে। এটা আমার কথা নয়। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা আদালতে এমন সাক্ষী দিয়েছে। আরেক ছেলের পাচার করা টাকা সিংগাপুর থেকে ফেরত এনে দেশের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছে। আর তাদের মা বেগম খালেদাও কম যান না। বিদেশ থেকে এতিমদের জন্য টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই টাকা তিনি মেরে খেয়েছেন।’
বিএনপির আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০১৪ সালে নির্বাচন ঠোকানোর নামে ৫৮২টি স্কুল পুড়িয়ে দিয়েছিলো। প্রিসাইডিং অফিসার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ২৭ জনকে হত্যা করেছিলো। খালেদা জিয়ার নির্দেশেই ট্রাক-বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারা হয়েছে। আমরা গাছ লাগাই, তারা গাছ কাটে। আমরা রাস্তা তৈরি করি, তারা ধ্বংস করে। যারা এমন ধ্বংসাত্মক কাজ করে, তারা মানুষের কল্যাণে কিভাবে কাজ করবে?’


আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছরের ২৮ থেকে ২৯ বছর আমরা ক্ষমতায় ছিলাম না। এই সময়ে দেশের, দেশের মানুষের উন্নয়ন হয়নি। আমরা ১৯৯৬ সালে যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসি তখন বিদ্যুতের উৎপাদন ছিলো মাত্র এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। পাঁচ বছরে আমরা তা বাড়িয়ে চার হাজার ৩০০ মেগাওয়াট করেছিলাম। খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণ হয়েছিলাম। দরিদ্রের হার কমেছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট বিদ্যুতের উৎপাদন কমিয়ে আনে। দেশকে কথিত ‘ভুতের হাটার’ মতো পিছনের দিকে নিয়ে যায়। বাংলা ভাইদের সৃষ্টি করে দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তবে আমরা ক্ষমতায় এসে বর্তমানে দেশে ১৬ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছি। দেশের ৮৩ ভাগ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে কোনো ঘর অন্ধকারে থাকবে না। যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব না, সেখানে আমরা সোলার প্যানেল দিচ্ছি, বায়োগ্যাস প্লান্ট করে দিচ্ছি। বছরের প্রথমে বিনা পয়সায় শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। এক কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের ১০টাকার ব্যাংক একাউন্ট খুলে দেওয়া হচ্ছে। বর্গা চাষিদের বিনা জামানতে কম সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষি উপকরণের কার্ড দিয়ে তাদের আর্থিকভাবে সচ্ছল করার কাজ চলছে।’
বিএনপি গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বিশ্বাস করে না উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেন, আমার হারানোর কিছু নেই। ১৯৭৫ সালে মা, বাবা, ভাই, বোনদের হারিয়েছি। এই হত্যাকান্ডের যাতে বিচার না হয় এজন্য তারা ইনডেমিনিটি আইন পাস করে। আমি ছয় বছর দেশে আসতে পারিনি। আমাদের বিচার চাইতে দেওয়া হয়নি। তারা এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করে। জাতির জনকের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সেই ভাষণ আড়াই হাজার বছরের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশে দারিদ্র্যের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমানে ২৩ ভাগ দারিদ্র রয়েছে। ২০২১ সালে এদেশে কোন দারিদ্রতা থাকবে না। বিএনপি আমলে নেমে আসে নির্যাতন। তাদের লুটপাটে দেশের অগ্রগতি থেমে যায়। আর আওয়ামী লীগ আমলে এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়। মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়। আমার বাবা যে দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন, আমি সেই দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবোই। আমি জাতির পিতার কন্যা। আমি দেশের উন্নয়ন করতে এসেছি। দুর্নীতি করতে আসিনি।
ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্কুলে স্কুলে এখন মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়নে ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার করা হয়েছে। যার মাধ্যমে নাগরিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। একটি বাড়ি একটি খামারের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িকে এক একটি কারখানায় রূপান্তরের কাজ চলছে। ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে বিনা পয়সায় ওষুধ। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও খেলাধুলায় তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। আমাদের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতির জনকের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়া।’


আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘আওয়ামী লীগ উন্নয়নে বিশ্বাস করে। তাই আমরা মনে করি আগামীতে যশোরের কেশবপুর, মণিরামপুর ও অভয়নগরের দুঃখ ভবদহের সমস্যা সমাধান করবে আওয়ামী লীগ। এছাড়া দেশের একটি বড় উপজেলা মণিরামপুর। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু এই উপজেলার রাজগঞ্জে একটি পুলিশ ফাঁড়ি করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। আমি রাজগঞ্জে একটি পুলিশ ফাঁড়ি করার দাবি জানাচ্ছি।’
জনসভায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য মাহাবুবুল আলম হানিফ বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, ‘বিএনপিরও কিছু অর্জন আছে। তাদের অর্জন হাওয়া ভবন খুলে দুর্নীতিতে দেশকে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন করা। তাদের আরেকটা অর্জন সারাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে দেশকে বিশ্বের কাছে কালো তালিকাভুক্ত করা। সেই বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছেন ২০১৮ সাল হবে বিএনপির বছর। যারা আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। খালেদা পরিবার সৌদিআরবে অর্থপাচার করে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। আগামী বছর সেই বিএনপির হবে না। হবে তাদের রাজনৈতিকভাবে বিদায়ের বছর। চিরতরে নির্বাসিতের বছর।’
যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদারের পরিচালনায় জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল স্বপন, যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন, মহিলা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য কামরুন নাহার লায়লা জলি, যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য রনজিৎ কুমার রায়, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম মনির, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য স্বপন কুমার ভট্টাচার্য্য, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য এসএম কামাল হোসেন, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদার, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, মুক্তিযোদ্ধা একেএম খয়রাত হোসেন, আব্দুল খালেক, অ্যাডভোকেট জহুর আহমেদ, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলী রায়হান, আব্দুল মজিদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ এমপি, যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আক্তার, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর জহুরুল ইসলাম, জেলা যুবলীগের সভাপতি মোস্তফা ফরিদ আহমেদ চৌধুরী, জেলা কৃষক লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন, জেলা মহিলা লীগের সভাপতি নূরজাহান ইসলাম নীরা, জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন, জেলা যুব মহিলা লীগের সভাপতি মঞ্জুন্নাহার নাজনীন সোনালী, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান মিঠু, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রওশন ইকবাল শাহী, সাধারণ সম্পাদক ছালছাবিল আহমেদ জিসান প্রমুখ।

শেয়ার