নবীন সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান মানুষের পাশে থেকো নিঃস্বার্থভাবে

সমাজের কথা ডেস্ক॥ সেনাবাহিনীর নবীন অফিসারদের ‘নিঃস্বার্থভাবে’ জনগণের পাশে থেকে দেশের সেবা করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৭৫তম দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের রাষ্ট্রপতি প্যারেড শেষে কমিশন পাওয়া অফিসারদের উদ্দেশে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে হলেও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই হবে তোমাদের জীবনের প্রথম ও প্রধান ব্রত। তোমরা নিঃস্বার্থভাবে জনগণের পাশে থাকবে এবং দেশের সেবা করবে।”
সেনা সদস্যদের যে কোনো দুর্যোগ ও দুঃসময়ে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, “তোমাদের মনে রাখতে হবে, তোমরা এদেশের সন্তান। জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তোমাদের সকলকেই সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার সমান অংশীদার হতে হবে।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এবারই প্রথম তিন বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ শেষে নবীন কর্মকর্তাদের কমিশন দেওয়া হল, যাকে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির জন্য ‘স্মরণীয় দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
কমিশন পাওয়া অফিসারদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকের দিনটি তোমাদের জীবনে অত্যন্ত আনন্দের এবং গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে তোমাদের উপর ন্যস্ত হচ্ছে দেশমাতৃকার মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে তোমাদের সজাগ ও সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।”
সেনা সদস্যদের বাহিনীর শৃঙ্খলা ও নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি অনুগত এবং অধীনস্তদের প্রতি সহমর্মী হতে হবে তোমাদের।”

দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখিয়ে সেনাবাহিনী দেশ-বিদেশে সব মহলের যে প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছ; তা আরও এগিয়ে নিতে বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের মানুষ শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জানবে- এটিই আমার প্রত্যাশা।”
শেখ হাসিনা এ অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে ক্যাডেটদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।
এদিন মোট সাড়ে তিনশ ক্যাডেট কমিশন পেয়েছেন, যাদের মধ্যে ফিলিস্তিনের পাঁচজন এবং শ্রীলঙ্কার দুইজন সেনা সদস্যও রয়েছেন।
২৯৩ জন পুরুষের পাশাপাশি মোট ৫০ জন নারী এবার সেনাবাহিনী কর্মকর্তা পদে কমিশন পেয়েছেন।
দেশের প্রয়োজনে বিভিন্ন সেবামূলক কাজে সেনবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ এবং তাদের পরিচয়পত্র তৈরিতে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এছাড়া দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক, সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণ, ভোটার তালিকা ও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও সেনা সদস্যরা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বলে বক্তৃতায় উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিজের পারিবারিক বন্ধনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তার ভাই ক্যাপ্টেন শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় ভাই লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ১৯৭৫ সালে রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টস থেকে প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পেয়েছিলেন।
“আমার ছোট ভাই রাসেলেরও ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে।”
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের প্রায় সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশের বাইরে থাকায় সেদিন প্রাণে বেঁচে যান শুধু শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একাডেমিতে পরিণত করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বক্তৃতায় তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে বিশ্বমানের একটি মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেওয়া উদ্যোগের তথাও মনে করিয়ে দেন।
১৯৭৪ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির উদ্বোধন করেন। ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “ওই দিন তিনি তার বক্তৃতায় নবীন সামরিক অফিসারদের পেশাগতভাবে দক্ষ, নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন এবং দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।”
কুচকাওয়াজের পর কমিশন পাওয়া নবীন অফিসাররা শপথ বাক্য পাঠ করেন।
এবারের কুচকাওয়াজে সোর্ড অফ অনার পেয়েছেন ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার সাদমানুর রহমান। সামরিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য ‘সেনাবাহিনী প্রধানের স্বর্ণপদক’ পেয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী নবীন অফিসারদের র‌্যাংক ব্যাজ পড়ানোর অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং মধ্যাহ্ন ভোজের আগে কমিশনিং কেক কাটেন।
এছাড়া বিএমএ অফিসার ক্যাডেটস ডরমিটরি, অফিসার্স সি/ডি টাইপ বাসস্থান এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টার অ্যাকাডেমি কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেন তিনি।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে সেনা প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল আজিজ, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার এবং বিএমএ কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আলম তাকে স্বাগত জানান।
মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনী প্রধান, বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা এবং কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের অভিবাবকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার