আগুনে দুই সন্তানের সাথে পুড়ে গেছে পরিবারের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বারান্দায় বুকফাটা আর্তনাদ করছেন বেলুকা বেগম। আগুনে পুড়ে দুই সন্তানের মৃত্যুতে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে স্বজনরা। পাশেই স্বামী হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছেন তানিয়া খাতুন। কোলে তিন বছর বয়সী ছেলে আরাফাত। দাদীর বুকফাটা আর্তনাদ, মায়ের বাকরুদ্ধ অবস্থা আর বাড়িতে আগত মানুষের অশ্রু মোছা দেখে শিশু আরাফাতও যেন বুঝে গেছেন এই পৃথিবীতে তার পিতা আজহারুল ইসলাম পিকলু বেঁচে নেই। সাথে চাচা রুহুল আমিন। মঙ্গলবার শহরতলীর ছোট শেখহাটির এই বাড়ির হৃদয়বিদারক পরিবেশ হয়ে এসেছে সোমবার রাতে। এদিন রাত ৯টার দিকে যশোরের কিসমত নওয়াপাড়া এলাকার একটি গ্যারেজে কাজ করার সময় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা গেছেন দুই ভাই আজাহারুল ইসলাম পিকুল (২৬) ও তার ছোট ভাই রুহুল আমিন (২৩)। তারা শহরতলীর ছোট শেখহাটির মৃত আবু বক্কার মোল্লার দুই ছেলে।
প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানালেন, পিকলু গ্যারেজ মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। তিন মাস হলো যশোর-মাগুরা মহাসড়কের কিসমত নওয়াপাড়া এলাকার রজনীগন্ধা তেলপাম্পের কাছে নতুন গ্যারেজ করেছিলেন নিজেই। ওই গ্যারেজে পিকলু ও তার ছোট ভাই রুহুল আমিন কাজ করতেন। দুই ভাইয়ের উপার্জনে সংসার চলতো তাদের। সোমবার রাতে একটি কেমিক্যালবাহী কাভার্ডভ্যানে ঝালাইকাজ করতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনের লেলিহানে দুই ভাই পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এতে পরিবারটি পথে বসেছে। বৃদ্ধ পিতা-মাতা, গৃহবধূ ও শিশু সন্তানের দেখার মতো কেউ নেই।
শেখহাটি এলাকার মুকুল হোসেন বলেন, ‘পিকলু গাড়ির ডেন্টিং-পেইন্টিং ও বডির কাজ করতেন। আগে তার দোকান ছিল নওয়াপাড়া রোডে। সম্প্রতি তিনি এখানে তার প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেন। তাদের উপার্জন ঘিরে স্বপ্ন দেখতেন বৃদ্ধ পিতা-মাতা। গৃহবধূ তার সন্তানের ভবিষ্যত আঁকতেন। যশোর জেলা মটর ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান মনু জানান, দুর্ঘটনাস্থলে চারটি গাড়ি আর কেমিক্যালসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যশোরের সহকারী পরিচালক পরিমল চন্দ্র কুণ্ডু।
জানতে চাইলে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম আজমল হুদা বলেন, বেনাপোল থেকে ঢাকাগামী ক্যামিকেল ভর্তি একটি কাভার্ড ভ্যান ঝালাই করা হচ্ছিল পিকলুর গ্যারেজে। এসময় আগুনের ফুলকি ছুটে কাভার্ড ভ্যানটিতে আগুন লাগে। দ্রুত তা অন্যান্য যানবাহনগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে দুইজনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এঘটনায় জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা। অপর কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স খুলনা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক আবুল হোসেন, যশোরের সহকারী পরিচালক পরিমল কুমার কুন্ডু এবং সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম।
সূত্র মতে, কেমিক্যালবাহী কাভার্ড ভ্যানটি বেনাপোল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। ওই কাভার্ড ভ্যানের মালিক এবং চালক হুমায়ুন কবীর সুমন ও হেলপার আশরাফুল ইসলাম ছিলেন। তারা ঝালাই করার জন্য প্রথমে ঝিকরগাছায় চেষ্টা করেছে। এরপর যশোরের আরো কয়েকটি গ্যারেজে গিয়েছিল। কিন্তু কেমিক্যাল বোঝাই থাকায় কেউই তার গাড়ি ঝালাই করে দিতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত কিসমত নওয়াপাড়ায় এসে ঝালাইয়ের কাজ করছিল। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার জন্য মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শোক প্রকাশ করেছে যশোর মটর ওয়ার্কসপ মালিক সমিতির ব্যবসায়ীরা।

শেয়ার