যশোরের রনি ও টিপুর ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প
ঠাঁই মিলেছে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট দলে

ইমরান হোসেন পিংকু
বিভাগীয় পর্যায়ের বয়স ভিত্তিক বিভিন্ন খেলায় বাহাতি পেস বোলার রনি হোসেন ও স্পিনার টিপু সুলতানের হাতের কারিশমা যশোরের ক্রিকেটামোদীরা ভুলে যাননি। এবার তারা তাকিয়ে আছেন নিউজিল্যান্ডের যুব বিশ্বকাপের দিকে। তাদের বিশ্বাস, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের হয়ে দাপট দেখাবেন যশোরের টিপু ও রনি। মুঠোফোনে টিপু ও রনির সাথে দৈনিক সমাজের কথার ক্রীড়া প্রতিবেদকের কথা হয়। রনি ও টিপুর ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনের গল্প নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন।
রনি হোসেন
বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন শিশু রনি হোসেন। দিনমজুর বাবা মতিয়ার রহমান তাকে ভালো একটা বল বা ব্যাট কিনে দিতে পারেননি। খুব ছোটোবেলায় কাঠের তকতা কেটে ব্যাট বানিয়ে খেলতেন বন্ধুদের সাথে। ভালো খেলতেন বলে গ্রাম্য টুর্নামেন্ট ডাক পড়তো তার। কিশোর রনি বন্ধুদের ব্যাটে খেলতেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার মির্জাপুরের বিভিন্ন মাঠে। রনির উৎসাহ ও ঘরোয়া পারফরমেন্স দেখে তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসেন মামা তরিকুল ইসলাম। ২০১২ সালে রনিকে যশোরের এসএস ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দেন। সাইকেলে প্যাডেল করে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে আসতো রনি। সেই বছরই প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে খেলতে এসে সাইকেল হারিয়ে যায়। রাস্তার খরচ পোষাতে না পেরে স্বপ্নটা যেনো থেমে যায়। এদিকে দ্বিতীয়বার সাইকেল কেনার টাকা দেয়ারও কেউ নেই। অভাবে আর ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে আসা হলো না। নিজে নিজেই প্র্যাকটিস করতেন। ২০১২’র শেষের দিকে কথা। একদিন খেলতে গিয়ে পরিচয় হলো জাতীয় দলের ক্রিকেটার সৈয়দ রাসেলের সাথে। তারই হাত ধরে আবারও স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রাখেন রনি। এবার ঝিকরগাছা ক্রিকেট একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ হয়। নিয়মিত অনুশীলনে পরের বছরই (২০১৩) চান্স পেয়ে যান অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট খেলার। পরে খুলনা বিভাগীয় ক্রিকেট দলে অনূর্ধ্ব-১৭ ও ১৮ খেলেন। এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সাথে অনূর্ধ্ব-১৮ এর প্রাকটিস ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে সবার নজর কেড়ে নেন। সেই সফলতার ফল হিসেবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে চান্স পেয়ে যান এই ডানহাতি পেসার রনি হোসেন।
টিপু সুলতান
শহরেরই ছেলে টিপু। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে ছোট। ছেলেবেলা থেকেই বাঁহাতি স্পিনার হিসাবে মহল্লায় সুখ্যাতি মেলে। এ কারণে মা রহিমা বেগম ছেলেকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে (২০০৯ সালে) বাবা আব্দুল কাদেরকে হারিয়ে সব যেনো হারাতে বসেন টিপু। দারিদ্র্যের কষাঘাতে অস্থির তখন পরিবার। শিশু টিপুকেও ছোটোখাটো কাজে পরিবারকে সহায়তা করতে হয়। ফলে ক্রিকেট খেলাও আর নিয়মিত হয়ে ওঠে না। এলাকার গণ্যমান্য লোকজন ক্রিকেটে টিপুর অনুপস্থিতি অনুভব করেন। পরে তার মাকে বোঝালে মা রাজি হয়ে যান। ২০১০ সালে কোচ আজিমুর হকের যশোর ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেন মা রহিমা বেগম। বড় ক্রিকেটার হতে হবে টিপুকে। এখন এই স্বপ্ন শুধু তার একার না। মায়ের, এলাকার লোকজনের। তালিম নিতে থাকেন কোচ আজিমুল হকের কাছে। ওই বছরে ইয়াং টাইগার্স স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতা থেকে শুরু হয় টিপুর বা’হাতের খেল্। এরপর টিপু যশোরে অনূর্ধ্ব-১৪ এবং খুলনাতে অনূর্ধ্ব ১৬ ও ১৮ দলের খেলার সুযোগ পান। অনূর্ধ্ব-১৮তে টিপু সুলতান তার বা-হাতের ঘূর্ণি বলে ৩ ম্যাচে ১৪ উইকেট নেন। বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে আর এক ধাপ এগিয়ে যান ২০১৫-১৬ মৌসুমে। সেই বার ঢাকা দ্বিতীয় বিভাগের কাকরাইলে বয়েজ ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পান টিপু। কাকরাইলের দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচে ৫ উইকেট তুলে নেন। শুধু তাই নয়, ঘূর্ণি বোলিংয়ে ১৪ ম্যাচে ৩১টি উইকেট নেন টিপু। তার কাঁধে ভর করে ওইবার কাকরাইল বয়েজ ক্লাব চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ঢাকা প্রথম বিভাগে উন্নীত হয় দলটি। ঢাকা প্রথম বিভাগে ২০১৬-১৭ মৌসুমে ১৬ ম্যাচে ৩৪ উইকেট তুলে নেন বাঁহাতি স্পিনার টিপু সুলতান। আর এই আসরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের হাত থেকে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার নেন টিপু। এরপর আর তাকে ফিরে থাকতে হয়নি। সুযোগ মিলে যায় নিউজিল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে খেলার।
উল্লেখ্য, ২৬ ডিসেম্বর নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করবে অনূর্ধ্ব-১৯’র বাংলাদেশ দল। অনূর্ধ্ব-১৯’এ এর আগে ২০০২ সালে যশোরের মুরাদ খান খেলেছিলেন।

শেয়ার