আগামীর যশোর ।। মাহমুদুল হাসান শোয়েব

ভৈরব নদীর কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসিদ্ধভূমি রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর, বৃদ্ধি পেতে পেতে আজ যা ২৭৪ বর্গ কি.মি. বিস্তৃত একটি জেলা। বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন এই জেলা-শহরের প্রাচীন নাম ছিল মুড়লী কসবা। নকশি কাথা, চিরুনি আর খেজুরের গুড়ের জন্য বিখ্যাত যশোর আজ অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নীতি-নির্ধারকদের দূরদৃষ্টির অভাবে ধীরে ধীরে তার শেকড়কে ভুলতে বসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে অবহেলা করে উন্নত দেশগুলোর ঝকঝকে তকতকে শহরের আদল অন্ধভাবে অনুকরণ করার প্রবণতা রাজধানী শহর ঢাকার মতো যশোরেও লক্ষণীয়। সর্বোপরি সামগ্রিক কোন নগর উন্নয়ন কৌশল এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন রূপরেখা না থাকার দরুন নগর নির্মাতারা বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে টুকরো টুকরোভাবে প্রতিকার করার চেষ্টা করে চলেছেন। যেখানে প্রকৃত অর্থে যশোরের ঐতিহাসিক নগর-বুননকে হদিস করা সম্ভব হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে এর একটি বড় কারণ হচ্ছে-এই শহরের সাথে প্রতিদিন যারা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নগর পরিচালনা কৌশল তৈরির সময় তৃণমূল পর্যায়ের সেইসব মানুষের মতামতের প্রতিফলন বরাবরই অনুপস্থিত। অতঃপর ‘শহর হোক সবার’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের নগর নকশা স্টুডিওতে যশোরের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাগুলোকে পর্যালোচনা করে মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে শুরু করে সমন্বিত শহর তৈরির প্রস্তুতি, এই তিন টি বিষয় হল: ১) টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ ২) শহর-ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণ ৩) নদী সংলগ্ন এলাকার ব্যবস্থাপনার উন্নতি।

দীর্ঘ ৬ মাস ৩৬ জন ছেলেমেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয় আধুনিক যশোরের ৬টি ভিন্ন ভিন্ন নগর-দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন ৬টি পরিপূর্ণ রূপরেখা। এই রূপরেখাগুলো প্রণয়নের পূর্বে ছাত্র-ছাত্রীরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং সমন্বিত শহর নির্মাণ সম্বন্ধে একটি সম্যক ধারণা তৈরি করে নেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরণের জরিপ এবং বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে প্রস্তাবিত হয় তাদের উদ্ভাবনী শহর নির্মাণ প্রকল্প। এই পুরো প্রক্রিয়াতে ছিল যশোরের বিভিন্ন কমিউনিটির স্বাচ্ছন্দ্য অংশগ্রহণ, একই সাথে নিশ্চিত করা হয়েছে নগর কর্তৃপক্ষের নিয়ম-নীতিমালা এবং নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত।

নকশী কাঁথার এক একটি ফোঁড় যেমন সমন্বিত হয়ে তৈরি করে একটি সম্পূর্ণ কাঁথার জমিন, তেমনি এই তরুণ নগর নকশাবিদেরা শহর-ঐতিহ্যের প্রতিটি উপাদানকে সমন্বয় করে মানুষের কাছে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে ঐতিহাসিক এবং সম্ভাবনাময় যশোরকে যার প্রতিটি বুননে রয়েছে এর গৌরব গাঁথা, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার আর আগামীর স্বয়ংসম্পূর্ণ টেকসই যশোর।

এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২০ ডিসেম্বর যশোরের টাউন হলে দিনব্যাপি অনুষ্ঠিত হবে ‘আগামীর যশোর’ এর উন্মুক্ত প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ হলো সম্পূর্ণ ৬টি ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো যশোরকে নতুনভাবে দেখা, এর ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অনুধাবন করা এবং স্বাধীনভাবে নিজের অভিমত প্রকাশ। সকলের স্বতঃস্ফূর্ত পদচারনায় মুখরিত হোক প্রদর্শনী প্রাঙ্গণ।

শেয়ার