পাকিস্তানী দোসরদের কারণে ৭১’র স্বপ্ন এখনও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি: দোদুল

তুষার আহসান
১৯৭১ সালে যশোর সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আফজাল হোসেন দোদুল। ২৫ মার্চ কালরাতের ভয়াবহতা দেখে তার তরুণ হৃদয় ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পাকিস্তানীদের হটাতে এবং সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার স্বপ্নে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ জন্মে। মনে মনে সুযোগও খুঁজতে থাকেন। এক সুযোগে অনেক কষ্টে মাকে রাজি করিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন তিনি।
বর্তমান বাংলাদেশে সেই সময়ের আশা আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। দেশ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশ এখন ডিজিটালাইজড হচ্ছে। কৃষকরাও কাজের ফাঁকে মোবাইলে তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিচ্ছেন। যদি মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ক্ষমতায় থাকে, তাহলে নিশ্চয় সকল স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধকালীন যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা পাকিস্তানী দোসরদের কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। সেজন্য এখনো সেই সময়ের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন শতভাগ সফলতার মুখ দেখেনি।’ মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুল বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা একমাত্র দেশকে ও দেশের মানুষকে পাকিস্তানী অপশক্তির হাত থেকে মুক্ত করে সুনির্মল স্বাধীন বাতাস আনতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তারা নির্লোভ ছিলেন। বিজয় অর্জনের পর যদি তাদেরকে যোগ্যতা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োগ দেয়া যেতো তাহলে দেশটির চিত্র আরও আগে ভালো অবস্থানে পৌঁছে যেতো। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হতো না। অথচ আজ মুক্তিযোদ্ধারাই বিভিন্ন অফিস-আদালতে অবহেলিত।’
তিনি নতুন প্রজন্মকে সব ধরণের অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘স্বাধীনতা বিরোধীরা কোনো ভাবেই কোথাও স্থান গড়তে না পারে সেদিকে জনগণকেই সচেতন হতে হবে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’
মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ৮ নম্বর সেক্টরের (যশোর, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুর) অধীনের সাব-সেক্টর বয়রার একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘তখন একাত্তরের অক্টোবর মাসের প্রথম। দুপুরের খাওয়া শেষে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পশ্চিমবঙ্গের বয়রা ক্যাম্পের তাবুতে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ গোলাবর্ষণের শব্দ কানে এলো। দিগি¦দিক প্রকম্পিত করা শব্দ। শব্দ ক্রমেই বাড়তে থাকে। তাবুর আশপাশে মর্টার শেল এসে পড়তে লাগল। তাবুতে থাকা সবাই ভয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করল।
তখন সাব-সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদার (বীর বিক্রম, পরে কর্নেল, ১৯৭৫ সালে নিহত) নির্দেশে গেরিলা দল, ভারত থেকে সদ্য প্রশিক্ষণ শেষ করা ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় ও বাংলাদেশ সেনা ও ইপিআরের (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) নিয়মিত বাহিনী মিলে ৫০ থেকে ৬০ জনের আমাদের দল যুদ্ধ সাজের প্রস্তুতি নেয়। আমরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বয়রা বাজারের বিপরীতে বাংলাদেশ সীমান্তের চৌগাছার কাবিলপুর বাজারে এসে অবস্থান নিই। এখান থেকে পাঁচ থেকে ছয়শ’ গজ দূরত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। আমাদের ক্ষিপ্রতার কাছে পাকিস্তানীরা শেষ পর্যন্ত ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। আমরা পাকিস্তানিদের ক্যাম্প দখল করে নিই। সেখান থেকে তিনজন পাক সেনাকে আহত অবস্থায় আটক করি। পরে ভারতীয় বিমান এসে ওই তিনজনকে নিয়ে যায়।’

শেয়ার