স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার দেখে যেতে পেরে সান্ত্বনা পাই: ইউনুস আকবর

মোতাহার হোসেন, মণিরামপুর॥ ৪৭’সালে দেশ ভাগের পর থেকে পাকিস্তান শোষক গোষ্ঠীর বৈষম্যের শিকার বাঙ্গালী জাতিকে অন্ধকার থেকে জাগিয়ে আলোর পথে নিয়ে আসতে জাতির ইতিহাসে হিরন্ময় দ্যুতিতে চির ভাস্বর বাংলাদেশের মহান স্থপতি, রাখাল রাজা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র ৭ মার্চের ভাষণের পর কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানী হায়নাদের হাত থেকে দেশমাতাকে শত্রুমুক্ত করতে ৭১’র টগবগে যুবক মণিরামপুর উপজেলার ব্রাহ্মণডাঙ্গা গ্রামের জামির আলীর ছেলে ইউনুস আকবর মাতৃভূমি স্বাধীন করে শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার আকাক্সক্ষায় যোগদেন মুক্তিযুদ্ধে। তার স্বপ্নের দেশটিতে ভেদাভেদ ভাঙ্গার প্রত্যাশা ছিলো। যেখানে মৌলিক পাঁচ অধিকার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা) প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য ভুলে যাবে মানুষ। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এর অনেকটাই আজ পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ইউনুস আকবর তখন আইএ (এইচএসসি) পরীক্ষার্থী। স্বাধীন দেশের যে চিত্র মনে ধারণ করে তিনি দেশমাতাকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করতে গিয়েছিলেন তার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তখন আমি মণিরামপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। ৭ মার্চের ভাষণের পর আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি যশোরে আসেন। ওইদিন ছাত্রলীগের নেতাদের নিয়ে (যারা নিউক্লিয়াসের সদস্য ছিলেন) তসবীর মহলে গোপন মিটিং করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেন। যেখানে তখনকার জেলা ছাত্রলীগ নেতা আলী হোসেন মনি, রবিউল আলম, সালাউদ্দীন, শেখ সালাম, মতলেব মাস্টার, বিকুসহ ১৪/১৫ জন উপস্থিত ছিলেন। তিনি (মনি) ভারতে গেরিলা ট্রেনিং করারও নির্দেশ দেন। এরপর মণিরামপুর থানার বিভিন্ন গ্রামের আমীর আলী, মাহবুর রহমান, আনছার আলী, মোসলেমসহ ৩০ জন যুবককে সংগঠিত করে ২৯ মার্চ ট্রেনিং-এর জন্য ভারতে যান। সেখানে অন্যদের কাঁঠালিয়া ক্যাম্পে ভর্তি করিয়ে, নিজে ভর্তি হন টালিখোলা ক্যাম্পে। শুরু হয় দেশকে স্বাধীন করার দীক্ষা, স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পরীক্ষা। অবশেষে সেই পরীক্ষায় বীরদর্পে পাস করি আমরা। পাকিস্তানী সেনাদের তাড়িয়ে পাই স্বাধীন ভূমি।’
সেই সময়ের আশা আকাক্সক্ষার ও স্বপ্নের সাথে বর্তমান বাংলাদেশে প্রাপ্তি সম্বন্ধে মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আকবর বলেন, ‘স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরী দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে। তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। আমাদের দেশ এখন বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর রাজাকার কর্তৃক তিন বার তার বাড়ি-ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বাধীরনতা উত্তর বঙ্গবন্ধু দেশকে যখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঘাপটি মেরে থাকা সেই পাকিস্তানী দোসররা তাকে হত্যা করে।’
১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং-এর শিক্ষার্থী ইউনুস জহুরুল হক হলে থাকতেন। সে সময়ের ঘটনায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়। এরই সাথে স্বাধীন দেশে তার (ইউনুস) স্বপ্নেরও মৃত্যু হতে থাকে। ৭৫ পরবর্তী শাসক জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে। তিনি শাহ আজিজুর রহমান, আব্দুল আলীমসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসিত করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠান। স্বাধীনতা যুদ্ধের সরাসরি বিরোধীতাকারী আল-বদর, আল-শামস নেতাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়তে দেখে তার (ইউনুস) মতো হাজারো মুক্তিযোদ্ধার হৃদয় স্পন্দনে রক্তক্ষরণ হয়েছে।’
কিন্তু এতকিছুর পরও আজ স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার কার্যকর হয়েছে এবং হচ্ছে- দেখে যেতে পেরে সান্ত্বনা খুঁজে পান মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আকবর। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লাখো মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন এখনকার যুব ও তরুণ সমাজ লালন করে দেশকে নেতৃত্ব দিবে। তারাই বিজয়ের কেতনকে ধুলি-ময়লা মুক্ত করে সমাজকে বদলে দেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

শেয়ার