প্রত্যাশার ৮০ ভাগ পূরণ হয়েছে: ইয়াকুব আলী মোল্যা

এস হাসমী সাজু
বাংলার মানচিত্র বিশ্বের বুকে আঁকতে, নিজেদের অধিকার ও ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধ করেছিলেন ডা. ইয়াকুব আলী মোল্যা তাদেরই একজন। বাগেরহাট জেলার চিতলমারি উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে ১৯৫০ সালের ১৬ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া এ ব্যক্তি ১৬ বছর বয়সে ৯নং সেক্টর থেকে গেরিলা বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় তিনি পিরোজপুরের নাজিরপুর গ্রামের মাঠভাঙ্গা মহাবিদ্যালয়ে এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। কর্মক্ষেত্রের সুবাদে তিনি ১৯৮০ সাল থেকেই যশোর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। চাকরি করেছেন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে। এখন আছেন অবসরে।
শুক্রবার দুপুরে এই প্রতিবেদকের কাছে যুদ্ধকালীন সময়ের বিভিন্ন ঘটনা, আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে সমাজের কথার সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর একাধিক ক্যাম্প ছিল বাগেরহাটের বোয়ালিয়া গ্রামে। এ সময় ওই গ্রামের অধিকাংশ বাঙ্গালি পাকিস্তানীদের উর্দু কথা বুঝতে পারতেন না। পাকবাহিনী এ সময় কারণে-অকারণে অকথ্য নির্যাতন চালাত সাধারণ মানুষের উপরে। এই নির্যাতন থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে অ্যাডভোকেট আব্দুর সবুর গ্রামের যুবকদের সুসংগঠিত করতে শুরু করেন। তিনি ডা. ইয়াকুব আলী মোল্যার বাড়িতে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা বলেন। তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ মাটি ও মানুষের মুক্তির জন্য নতুন প্রজন্মকে আধুনিক বাংলাদেশ উপহার দিতে, বাঙালিদের মুখের ভাষা বাংলা ভাষা এবং মৌলিক পাঁচটি অধিকার ফিরিয়ে আনতে যুদ্ধে অংশ নেন।
এর আগে তিনি ১৯৭১ সালে ৩শ’ জনের একটি টিমের সাথে ভারতের আসামের তেজপুরে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা ট্রেনিং গ্রহণ করেন। দেড়মাসে ট্রেনিং শেষ করে ৯নং সেক্টর মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লার কসবা, আখাউড়া, বরিশাল গৌরনদীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে পাক হানাদার বাহিনীকে প্রতিহত করতে যুদ্ধ শুরু করেন। ১৮০ জনের গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন অ্যডভোকেট আব্দুর সবুর। কমান্ডারের নির্দেশে বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ চলাকালে তার অনেক বন্ধু ও সহযোদ্ধা রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকহানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ চলাকালে নভেম্বর মাস থেকে বিভিন্ন এলাকা শত্রুমুক্ত হতে শুরু করে। পাকহানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর দেশ বিজয় অর্জন করে। বিশ্বের মানচিত্রে যুক্ত হয় বাংলাদেশের মানচিত্র। নিজের লেখা কবিতার একটি অংশ ‘ক্ষুধায় অন্ন পরনে বসন/ শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান/ সবার জন্য হবে সমাধান/ থাকবে না আর দুঃশাসন/ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর এটাই স্বপ্ন’ উল্লেখ করে এই বীরযোদ্ধা বলেন, বিজয়ের পর প্রত্যাশা ৮০ ভাগ পূরণ হলেও এখনো ২০ ভাগ অপূর্ণ রয়েছে। আগামীতে বঙ্গকন্যা আবারও নির্বাচিত হলে অবশিষ্ট পূরণ হবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিষয় উল্লেখ করে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে আরও আগে হওয়া উচিৎ ছিল। বিভিন্ন জটিলতার কারণে সম্ভব না হলেও বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে করছেন। আগামীতে বাকিদের বিচার করা হবে। তিনি আরও বলেন, ভালো কাজে বাধা থাকে, বাকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে সরকারকে আরও বাধার সম্মুখীন হতে হবে। এই বাধাকে বাংলার মানুষ একসাথে প্রতিহত করলে বিচার করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীনের পর ডা. ইয়াকুব আলী মোল্যা এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক থাকা অবস্থায় ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি নিজের চেম্বারে সেবা দিচ্ছেন। ব্যক্তি জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জনক তিনি। তার দু’সন্তানই চিকিৎসক। তার পিতা মরহুম ইউসুফ আলী মোল্যা ও মাতা মহিতুন নেছা। তিনি আগামী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানার আহবান জানিয়েছেন।

শেয়ার