সেই ভবদহে ফের জলাবদ্ধতা

দেবু মল্লিক:  যশোরের সেই ভবদহ পাড়ের সাত লক্ষাধিক মানুষ ফের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে। গত কয়েক দিনের বর্ষণে ওই এলাকার ১৩০টি গ্রামের অধিকাংশ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় পানি জমে আছে। কোন কোন স্কুলের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে পানি। ভেসে যাচ্ছে ঘেরের শত শত কোটি টাকার মাছ। গত বছরের মতো পানিবন্দি অনেকে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি নিয়ে পাকা রাস্তা ও ভেড়ি বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে।
যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী দাবি করেছেন, আগের চেয়ে ভবদহ এলাকার নদীর অবস্থা ভাল। দুইটি স্কেভেটর দিয়ে আগে থেকে খনন কাজ চলছে। বর্তমানে একটি নষ্ট হয়ে গেছে। তবে তা দ্রুত মেরামত করে আবার খনন কাজে লাগানো হবে।


যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর, ঝিকরগাছা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা থানা এলাকার ৫২টি বিল এলাকা ভবদহ নামে পরিচিত। এসব অঞ্চলের পানি বের হওয়ার জন্য বিরাট একটি স্লুইস গেট আছে। কিন্তু পলি পড়ে স্লুইস গেটের দুই পাশে ভরাট হয়ে গেলে আশির দশকে এই অঞ্চলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সেই থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জলাবদ্ধতা নিরসনে শত শত কোটি টাকা খরচ করেছে। গত অর্থ বছরেও এই অঞ্চলের পানি নিস্কাশনের জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু তার কোন ইতিবাচক ফল হয়নি। গত কয়েক দিনের বর্ষণে ফের ডুবতে বসেছে ভবদহ অঞ্চল।
পানি উন্নয়ন বোড বলছে, গত অর্থ বছরে এই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য হরিহর নদীর পালি অপসারণে ৮০ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। ভবদহ স্লুইস গেটের উজান ও ভাটিতে ব্যয় করা হয়েছে আরো অর্ধকোটি টাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, জ্যৈষ্ঠে দুই দফা ভারিবৃষ্টিতে ভবদহ অঞ্চলের সব বিল পানিতে ভরে যায়। সরকারি খাল দখল করে অবৈধভাবে ঘের তৈরি ও নদীগুলো পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি বিলের মধ্যে পানি জমে যায়। আর সর্বশেষ শ্রাবণে এসে গত কয়েক দিনের ভারি ভর্ষণে অধিকাংশ এলাকায় বিলের পানি উপচে বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। কোন কোন এলাকার রাস্তাও তলিয়ে গেছে।
সরেজমিন খবর নিয়ে জানা গেছে, মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ ইতিমধ্যে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে।
শ্যামকুড় ইউনিয়ন, চালুয়াহাটি ইউনিয়ন, নেহালপুর ইউনিয়ন, কুলটিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামই এখন পানিতে বন্দি। শ্যামকুড় ইউনিয়নের হাসাডাঙ্গা গ্রামের হামেদ গাজী বলেন, ‘গত বছর পানিতে বাড়িঘর সব ভেঙে যায়। কয়েক মাস রাস্তার উপর ছিলাম। এখনো সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারিনি। এরই মধ্যে আবার পানি বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেছে। গরু, ছাগল নিয়ে আবার রাস্তার উপর থাকতে হবে।’ স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল হালিম বলেন, ‘হরিহর নদীর পানি উপচে পড়ে এলাকা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকের বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে।’ উপজেলার পাজবাড়িয়া গ্রামের বাদল মল্লিক, কুমার মল্লিক, কুমারসীমা গ্রামের অমিয় কুমার রায়, গৌত্তম মল্লিক, তাপস কুমার রায়, প্রনব রায় বলেন, ‘শুনেছি আমাদের জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু জল তো বাড়ি উঠে গেছে। গত বছরের মতো এবারও দুই এক দিনের মধ্যে রাস্তায় যেতে হবে।’
একই অবস্থা যশোরের কেশবপুর উপজেলার। সেখানে বন্যায় ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে শহরের ৯ ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকাসহ উপজেলার প্রায় ৪০টি গ্রাম। ভেসে গেছে দুই হাজার ৩১৮টি ঘের ও তিন হাজার ২৫০টি পুকুরের মাছ। সরকারি হিসেবে এখনো পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ৩২ কোটি টাকা। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার। এরমধ্যে যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের দুই ধারে মধ্যকুল ও হাবাসপোল এলাকায় প্রায় ৪০০ পরিবার, আলতাপোলে ৭৫টি ও বাজিতপুরে ৩০টি পরিবার টংঘর বেঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের শহরের কেশবপুর ডিগ্রি কলেজ, পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পাইলট বালিকা বিদ্যালয়, মধু শিক্ষা নিকেতন, মধ্যকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বালিয়াডাঙ্গা স্কুলসহ নয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সেখানে আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে। এছাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়ন, মঙ্গলকোট, পাঁজিয়া ও বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের মুলগ্রাম, পাঁজিয়া পূর্বপাড়া, বাকাবর্শি, বেলকাটি, গড়ভাঙ্গা ও ব্যাসডাঙ্গাসহ অন্তত ৩১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে তলিয়ে গেছে প্রায় দেড় হাজার পরিবার।
উপজেলার মধ্যকুল গ্রামের গৃহবধূ রেক্সনা খাতুন বলেন, ‘ঘরের মধ্যে পানি জমে গেছে। কথা বলে কী হবে? আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই।’ একই অভিযোগ একই গ্রামের ওবায়দুর রহমানের।
কেশবপুর উপজেলা পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিকী অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রভাবশালীরা গড়ে তোলা অপরিকল্পিত মাছের ঘেরের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ প্রতিবছর জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে। আমরা বিষয়টির সুষ্টু সমাধানের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা দেখেও না দেখার ভান করে চলেছে।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আলমগীর হোসেন জানান, অতিবৃষ্টিতে উপজেলার দুই হাজার ৩১৮টি মাছের ঘের ও তিন হাজার ২৫০টি পুকুর ভেসে গেছে। প্রাথমকিভাবে ধারণা করা হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩২ কোটি টাকা হবে।
কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) কবীর হোসেন জানান, আশ্রয়হীনদের জন্য ৯টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দশ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

 

শেয়ার