কলারোয়ায় ফের ‘উঠাও বাচ্চা’ লটারির নামে জুয়া খেলা ॥ সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ

আব্দুল জলিল, সাতক্ষীরা ॥ সাতক্ষীরার কলারোয়ায় আবারও শুরু হয়েছে উঠাও বাচ্চা লটারির নামে জুয়া খেলা। আর এই লটারির অনুমতি দিয়েছেন স্বয়ং জেলা প্রশাসক ! তবে জেলা প্রশাসক আবুল কাসেম মহিউদ্দীন আয়োজক কমিটির এই প্রচারকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন বিষয়টি তার জানা নেই। আপনারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জিজ্ঞাসা করুণ। এদিকে কোন বাধা নিষেধ ছাড়াই কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর ফুটবল মাঠে চলছে এই লটারির নামে জমজমাট জুয়া খেলা। আর এ জুয়ার আসরের নাম দেয়া হয়েছে ঈদ আনন্দ মেলা। ঈদের দীর্ঘ ১৬ দিন পর গত ১২ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে এই ঈদ আনন্দ মেলা। আর এই মেলার প্রধান আকর্ষন দৈনিক স্বপ্নের ঠিকানা র‌্যাফেল ড্র ও দ্যা এল এন সার্কাস। আর র‌্যাফেল ড্র মঞ্চ নাচ পরিবেশন করছে ঢাকা, খুলনা ও যশোরের মেয়েরা। তবে কিভাবে এই লটারির নামে জুয়া চলছে এর সদুত্তোর দিতে পারেননি কেউ। ২০ টাকার বিনিময়ে টিবি ফ্রিজ, স্বর্ণের অলংকার, মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন পুরুস্কার দেয়ার কথা প্রচার করে প্রতিদিন শতাধিক ভ্যান ও ইজবাইক লটারির টিকিট নিয়ে সাতক্ষীরা ও যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছে। বিক্রি হচ্ছে লাখ লাখ টাকার লটারি টিকিট। অথচ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে মাত্র এক থেকে দুই লাখ টাকার। আর এভাবে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে মেলা কমিটি ও র‌্যাফেল ড্র পরিচালকরা লাখ লাখ টাকা। রাত ১০টার সময় শুরু হয় দৈনিক স্বর্প্নের ঠিকানা র‌্যাফেল ড্র। আর র‌্যাফেল ড্র শুরু হওয়ার আগেই এই মঞ্চে চলে কৌতুক আর নিত্য। আর কলারোয়ার একটি স্যাটেলাইট টিভি এই খেলা নিয়মিত দেখাচ্ছে।
কলারোয়া উপজেলার কেঁড়াগাছি গ্রামের মিলন, মদনপুর গ্রামের সিরাজ ও বুঁজতলার গফুর জানান, ১২ তারিখে এই দৈনিক স্বপ্নের ঠিকানা র‌্যাফেল ড্র শুরু হয়। ইতিমধ্যে একজন সেলুন কর্মচারি একটি ফ্রিজ ও নৈশ্য প্রহরি একটি টেলিভিশন পুরস্কার পেয়েছেন। আজকের পুরস্কার জামাই বাবুর উপহার শ্বশুর বাড়ির হোন্ডা মোটরসাইকেল, বউয়ের স্বপ্ন স্বর্ণের অলংকারসহ একাধিক লোভনীয় পুরস্কারের কথা বলে প্রতিদিন শতাধিক ভ্যান ও ইজিবাইক গ্রামের হাট-বাজারে সকাল থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি করে। এভাবে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে লাখ লাখ টাকার টিকিটি। অথচ পুরস্কার দেওয়্া হয় দুই থেকে তিন লাখ টাকার। বাকি টাকা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরের ভাগ ঠিকমত পৌঁছায়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ আকর্ষনীয় পুরস্কারের আশায় টিকিট কিনে সর্বস্ব হরাচ্ছে ভ্যানচালক, সাধারণ মানুষ, স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার তলুই গাছা গ্রামের আহম্মদ আলী ও কলারোয়ার গোয়াল চাতর গ্রামের আরশাদ আলী জানান, একি শুরু হল, সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যে টাকা হচ্ছে সেই টাকা দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য না কিনে, কিনছে লটারির টিকিট। আর যখন পুরস্কার পাচ্ছে না তখন উঠছে মাথায় হাত। বাড়ির মহিলারা হাঁস মুরগি বিক্রি করে আবার কেউ কেউ ঘরের চাউল বিক্রি করে এই লটারির টিকিট কিনছেন। জানাজানি হয়ে যাওয়ায় সংসারে ঘটছে অশান্তি। স্কুল কলেজেরর ছেলে মেযেরা বিভিন্ন অজুহাতে পিতা মাতার নিকট থেকে টাকা নিয়ে লটারি টিকিট কিনছে। এই তথ্য সংগ্রহ কালে গয়রা বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ি এই প্রতিবেদককে জানান, জেলা প্রশাসক কিভাবে এসব জুযার অনুমোদন দেয় এটা কল্পনা করা যায় না। এক মাস যাবত এই মেলা চললে মানুষের কাছে আর টাকা থাকবে না। এলাকায় অপরাধ বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষ ব্যাপক ভাবে ক্ষতি গ্রস্থ হবে। করো কিছু করার থাকবে না। কলারোয়ার এলাকার মোশারাফ, সোনাবাড়িয়ার সামসুর ও শহিদুল ডাক্তার জানান, শুনেছি জেলা প্রশাসক কলারোয়া উপজেলার মধ্যে এই র‌্যাফেল ড্র’র টিকিট বিক্রি করতে অনুমতি দিয়েছেন। অথচ সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, যশোর জেলার শার্শা উপজেলায় ১’শ একটি ভ্যান ও ইজিবাইকে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।
এদিকে সার্কাস দেখতে আসা দর্শকরা জানান, সার্কাস মানে কিছু জীব জন্তু থাকছে। তারা একটু খেলা দেখাচ্ছে। সব শ্রেণীর লোকজন খেলা দেখতে পারছে। জীবজন্তু কিছু আছে তবে সে দিকে আকর্ষন কম। তারা আরো জানান, যুবতি মেয়েদের নগ্ন নাচ মানে কি সার্কাস ? এমন সার্কাস তো আগে কখনও দেখিনি।
চন্দনপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনছার আলী জানান, রমজান মাসে ম্যানেজিং কমিটির লোকজন এসে আনন্দ মেলার নামে তার নিকট থেকে একটি ছাড়পত্র নেয়। কমিটির অন্যতম সদস্য শওকাত খা ও অলিয়ার মেম্বর এই মেলার প্রধান সমন্বয়ক। তবে মেলার কথা বলে মেলার নামে দৈনিক স্বপ্নের ঠিকানা র‌্যাফেল ড্র বা সার্কাসের নামে অশ্লীল নৃত্য হবে এটা আমি জানতাম না।
চন্দন পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান জানান, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহি অফিসার, থানার ওসি অনুমতি দেয়ার পর তিনি অনুমতি দিয়েছেন। স্কুল কর্তপক্ষ আনন্দ মেলার অনুমতি না দিলে তো আর মেলা বসতো না। অলিয়ার মেম্বর, শওকাত আলী খাঁ আর প্রধান শিক্ষক আনছার আলীর নেতৃত্বে চলছে এই মেলা। তিনি আরো জানান, আমি এর মধ্যে নেই।
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার নাথ জানান, অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসক। দৈনিক স্বপ্নের ঠিকানা র‌্যাফেল ড্র বৈধ কি না তা তিনিই বলতে পারবেন। তিনি আরো জানান, জেলা প্রশাসক আইন-শৃঙ্খলা মিটিংয়ের প্রধান ।
কলারোয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টু জানান, দৈনিক স্বর্প্নের ঠিকানা র‌্যাফেল ড্র অনুমতি আছে কিনা বলতে পারবো না। তবে অশ্লীল নৃত্য হচ্ছে না। সার্কাস শুরু হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাসেম মো: মহিউদ্দীন জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনিকে জিঙ্গাসা করেন। তারা বলতে পারবেন। তিনি বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে আরো জানান।
সবমিলিয়ে প্রশাসনের সবাই জানে, আবার কেউ জানে না অবস্থায় কিভাবে অবৈধ এই জুয়া খেলা চলছে তা বোধগম্য না সচেতন মহলের ! এ ব্যাপারে সরকারের উপরিমহলের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

শেয়ার