সিকদার আনোয়ারুল ইসলাম অলিয়ার ১৬ ডিসেম্বর : বিজয়ের ও বেদনার

২৫ মার্চ, ১৯৭১ হতে বাঙ্গালী জাতি তার জাতির জনক, বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে। সারা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় কাতারের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাংলার দামাল ছেলেরা সেদিন তাদের যার যা ছিল যেমন- দা, খুন্তি, কুড়াল, লাঠি, সড়কি ইত্যাদি নিয়ে পাকিস্তানের আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করতে পিছপা হয়নি। কারণ বাংলার আপামর পুরুষ, মহিলা, বুড়া, যুবক-যুবতী তারা জানত যে, তাদের আর পিছু হঠার কোন উপায় নেই। তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাই বাঁচা মরা পরের কথা। বাঙালী জাতি তথা বিশ্বের দরবারে বাঙালী জাতি সত্ত্বাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আজ তাদের শেষ লড়াই সামনে উপস্থিত হয়েছে।
১৯৪৭ এর আগস্টের পর থেকে একে একে বহুবার বাংলার দামাল ছেলেরা বিভিন্ন পর্যায়ে জীবন দিয়েছে। রক্ত দিয়েছে অস্তিত রক্ষায়। বিশেষ করে বাঙ্গালীত্বকে রক্ষায় তারা রক্ত ঝরিয়েছে। কিন্তু কোন সময়ই তারা তাদের ন্যায্য অধিকার বা মুক্তি পায়নি, পায়নি জাতিসত্ত্বার সার্থক স্বীকৃতি। বরং বাঙ্গালী জাতীসত্ত্বাকে মুছে ফেলার চরম ষড়যন্ত্র বারবার মোকাবেলা করতে হয়েছে এই জাতিকে।
দেশের শতকরা ৫৬ জন মানুষের ভাষা বাংলাকে চরমভাবে উপেক্ষা করে মাত্র ১০ জন মানুষের ভাষা উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় বিশ্বাসঘাতকেরা। ঢাকার মাটিতে বসে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন পাকিস্তান জাতির পিতা মরহুম জিন্নাহ সাহেব। যার অকুন্ঠ সমর্থন-সহযোগিতা করেছিল বাংলার কতিপয় কুসন্তান। মরহুম নূরুল আমীন, খাজা নাজিম উদ্দিন ছিলেন অন্যতম। আরো ছিলেন ও তদানিন্তন মুসলিম লীগ নামধারী অনেক নেতৃবর্গ। সেদিন বাঙ্গালী জাতিকে তাদের বাঙ্গালীত্ব রক্ষার জন্য দিতে হয়েছে রক্ত, ঝরে পড়ে ছাত্রবীর রফিক, ছালাম, জব্বার, বরকত, সফিউর রহমান প্রমুখ।
১৯৬২ সালে শিক্ষার অধিকার রক্ষায় বাংলার দামাল ছেলেদের রক্ত দিতে হয়েছে। স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ৬-দফা আন্দোলনে ১৯৬৬ এর ৭ই জুনে দিতে হয়েছে রক্ত। ১৯৬৭-৬৮ সনে বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্র বাঙ্গালী জাতির পিতা শেখ মুজিবকে ঝুলতে হয়েছে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা আগরতলাতে। খাটতে হয়েছে বছরের পর বছর জেল। এক কথায় তার পুরো যৌবনটাই জেলে কেটেছে। বাংলার শত শত সন্তান রক্ত দিয়েছে ১৯৬৯ এর মহান গণ-আন্দোলনে। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ দীর্ঘ ২৩ বছর যাবত উপেক্ষিত ছিল। মৌলিক অধিকার, নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সামাজিক অধিকার এক কথায় সকল প্রকার স্বাধীন জাতির অধিকার, ছিল না শিক্ষার অধিকার বাঙ্গালীদের শতকরা এক ভাগও। ১৯৭০ এর কালজয়ী নির্বাচনে একচ্ছত্রভাব বাঙ্গালী জাতীয় রায়ের প্রতি চরমভাবে করা হয় অসম্মান ও উপেক্ষা।
তাই দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মাত্র ৯ মাস বাংলার দামাল ছেলেদের নিয়ে সংগঠিত মুক্তি বাহিনী ও পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের মিত্র বাহিনীর যৌথ আঘাত ও যুদ্ধের ফসল হিসাবে পাকিস্তানের ঐ জল্লাদ বাহিনী, ঐ মানুষ খেকো শৃগালরা সেদিন অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছরে নিরবে তারা যে অত্যাচার নির্যাতন চালায় তার চাইতে শত শত গুণ বেশি হারে তারা এই ৯ মাসে বাঙ্গালীদের বেশি ক্ষতি করে যায়। সেদিন ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে শিয়াল-কুকুরের মত হত্যা করেছে। লুন্ঠন করেছে আমার প্রায় দুই লাখেরও বেশি মা-বোনের ইজ্জত।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা না বলে পারা যায় না, এত সংগ্রাম, এত আন্দোলন ও রক্তক্ষীয় যুদ্ধের পরও পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র ২ দিন পূর্বে সদ্য জন্মগত শিশু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবিহীন করার জন্য এদেশীয় কিছু দোসর অর্থাৎ রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্যরা সঙ্গে থেকে পাক সৈনাদের সঙ্গে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলা মায়ের ১৪ জন বুদ্ধিজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। যা কোন সভ্য জগতে দেখা যায় না। যা সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীতে লাইনের বিষয়। মহান বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরকে পেতে বাংলার ঐ সময়কালের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকে ১৯৪৭ হতে ১৯৭১ পর্যন্ত ধাপে ধাপে বহু কিছু হারাতে হয়েছে। আজও ছেলেহারা, মা-বাপহারা, স্বামী হারা, ভাইহারা, স্ত্রী স্বজন পরিবারবর্গ হারা মানুষের হাহাকার বাংলার আকাশ বাতাস অভিশাপ বহন করে চলছে।
যা হোক, ১৬ই ডিসেম্বর বাংলার মানুষের বড়ই আনন্দের দিন। অন্য দিকে আবার বড়ই ব্যথার ও দুঃখের দিন। বহু ত্যাগ ও বহু মূল্যের মাধ্যমে পেয়েছি ১৬ই ডিসেম্বর। বলাবাহুল্য যে, ১৬ ডিসেম্বরকে যে বাঙ্গালী জাতী রক্তের মাধ্যমে ক্রয় করেছে এটা ভুলে গেলে হবে না। এটাকে মনে রেখেই এর উজ্জ্বল ও সুন্দর ভবিষ্যত, বিশেষ করে স্বাধীন দেশের মর্যাদায় পৌছানের জন্য সকলকে একযোগে লড়তে হবে এবং প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারলে মুছে যাবে সব কষ্ট-দুঃখ ও ত্যাগের যন্ত্রণা এবং ঘরে ঘরে শান্তি ও প্রকৃত আনন্দের জোয়ার বয়ে যাবে এবং সকল অত্যাচার, নির্যাতনের ব্যথা সেদিনই কেবল দূর হতে পারে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক,
সাবেক সরকারী কর্মকর্তা,
৬০ এর দশকের ছাত্রলীগ কর্মী

শেয়ার