বিজয় নিশান ঘরে ঘরে // আজ বাঙালির বিজয় দিবস

সমাজের কথা ডেস্ক॥ ‘সে এক বিষম জানকবুল জনযুদ্ধ/ ওরা প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল/ ওরা কিন্তু বিজয় দেখে যেতে পারেনি!/..আমরা তাই তাদের স্মরণ করি/ এই বিজয় দিবসে/ এই স্মরণ দিবসে/ যারা বিজয় দেখে যায়নি/ যাদের জীবন বিজয় বলে কিছু আসেনি/ যারা এ বাংলার জন্য যুদ্ধ করেছিল/ জয়বাংলা বলে/ তাদেরকে এসো আমরা স্মরণ করি/ এই বিজয় দিবসে/ এই স্মরণ দিবসে।’
সাবেক প্রধান বিচারপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মরহুম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে তাঁর লেখা ‘এই স্মরণ-দিবসে’ কবিতায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতিকে এভাবেই আবাহন করেছেন।
পূর্বাচলে আজ উদিত যে-সূর্য, প্রতিদিনের হয়েও সে প্রতিদিনের নয়; তার রক্তিমতায় তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত আমাদের মনে পড়বে; আকাশ যে-কোমলতায় আজ উদ্ভাসিত, একাত্তরের সম্ভ্রমহারা লাখো মা-বোন-জায়ার ক্রন্দনধোয়া সে-উদ্ভাস। ভোরের যে-রাঙা আলোটি আজ স্পর্শ করেছে ভূমি, স্বদেশের সেই পবিত্র ভূমি ভিজে আছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রক্তে; আর সেই রক্তস্রোতে মিশে আছে জাতীয় চার নেতার উষ্ণ শোণিত। দেনদরবার নয়, কারও দয়ার দানে নয়, সাগর সমান রক্তের দামে বাংলাদেশ অর্জন করেছে স্বাধীনতা, রক্ত সাগর পেরিয়ে বাঙালী জাতি পৌঁছেছে তার বিজয়ের সোনালি তোরণে। বিজয়ের পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্তিতে তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুয়াশায় জড়ানো হাল্কা শীতের বিকেলে রমনার রেসকোর্স ময়দানে দাম্ভিক পাকিস্তানী সেনারা যে অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে বাঙালীর বুকে, হাতের সেই অস্ত্র পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর নেতাদের সামনে। আজ বাঙালীর বিজয় দিবস। রক্তনদী পেরিয়ে আসা আনন্দ-বেদনায় মিশ্র মহান বিজয় দিবস আজ। বিজয়ের গৌরবেরÑ বাঁধভাঙ্গা আনন্দের দিন। একই সঙ্গে লাখো স্বজনহারানোর শোকে ব্যথাতুর, বিহ্বল হওয়ারও দিন।

তীব্র শোষণের কুহেলী জাল ভেদ করে একাত্তরের এই দিনটিতে প্রভাতী সূর্যের আলোয় ঝিকিমিকিয়ে উঠেছিল বাংলার শিশির ভেজা মাটি, অবসান হয়েছিল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সাড়ে তেইশ বছরের নির্বিচার শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতনের কালো অধ্যায়। নয় মাসের জঠর-যন্ত্রণা শেষে এদিন জন্ম নেয় একটি নতুন দেশÑ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ঝড়ের ভেতরে বিকশিত অটল বৃক্ষের জীবন্ত প্রতীক স্বাধীনতা নামের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আজও প্রচন্ড ঝাঁকি দেয় রক্তে, শাণিত করে চেতনা।
৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই সবুজ দেশে ৪৫ বছর আগে আজকের এই দিনে উদয় হয়েছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সূর্য। যে সূর্য কিরণে লেগে ছিল রক্ত দিয়ে অর্জিত বিজয়ের রং। সেই রক্তের রং সবুজ বাংলায় মিশে তৈরি করেছিল লাল-সবুজ পতাকা। সেদিনের সেই সূর্যের আলোয় ছিল নতুন দিনের স্বপ্ন, যে স্বপ্ন অর্জনে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল এ দেশের ৩০ লাখ মানুষ। কিন্তু বিজয় অর্জনের ৪৫ বছর পরও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবে রূপ পায়নি, শেষ হয়নি মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম। সেই সাম্যে দেশ আজও হয়ে ওঠেনি বাংলাদেশ।
তবে এবারের ডিসেম্বর আমাদের জীবনে নতুন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে। বিজয়ের ৪৫ বছরে ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং দন্ডাদেশ কার্যকর হচ্ছে। সারাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষের মনে একটা স্বস্তি এসেছে। জাতির কলঙ্ক কিছুটা হলেও মোচন হয়েছে। পাকিস্তান ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে এমনি এক অন্যরকম গণজাগরণ ও আবহে এবার বিজয় দিবস পালন করছে গোটা জাতি। এবারের বিজয় দিবস মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মৌলবাদ, জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা নিয়ে এসেছে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন সকালে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের কর্মকর্তা জন আর কেলি পৌঁছান সেনানিবাসের কমান্ড বাঙ্কারে। সেখানে নিয়াজী নেই, ফরমান আলীকে পাওয়া গেল বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত অবস্থায়। নিচু কণ্ঠে ফরমান আলী জানান, আত্মসমর্পণসংক্রান্ত ভারতীয় বাহিনীর প্রস্তাব তাঁরা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় ভারতে সেই সংবাদ পাঠাতে পারছেন না। কেলি প্রস্তাব দিলেন, জাতিসংঘের বেতার সঙ্কেত ব্যবহার করে তিনি বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন।
আত্মসমর্পণের জন্য বেঁধে দেয়া সময় সকাল সাড়ে নয়টা থেকে আরও ছয় ঘণ্টা বাড়ানো ছাড়া ভারতীয় বাহিনীর সব প্রস্তাব মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণের বার্তা পৌঁছানো হয় জাতিসংঘের বেতার সঙ্কেত ব্যবহার করে। ভারতে তখন সকাল নয়টা ২০ মিনিট। কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের (বর্তমান শেক্সপিয়ার সরণি) একটি দোতলা বাড়ি। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিবালয় আর প্রধানমন্ত্রীর দফতর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল। বরাবরের মতো সেদিনও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কক্ষের দরজা একটু খোলা। উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী অভ্যাসবশে ডান হাতের আঙ্গুল কামড়াচ্ছেন।
আনুমানিক সকাল ১০টায় তাজউদ্দীন আহমদের ফোনটি বেজে উঠল। ওই ফোনে গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছাড়া ফোন করতে পারে না। কী কথা হলো বোঝা গেল না। কিন্তু ফোন রেখে, চোখেমুখে সব পাওয়ার আনন্দ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, ‘সবাইকে জানিয়ে দাও, আজ আমরা স্বাধীন। বিকেল চারটায় আত্মসমর্পণ।’ প্রধানমন্ত্রী নিজেই অবশ্য খবরটি সবাইকে শোনালেন। আর বললেন, কাজের প্রথম পর্যায় শেষ হলো কেবল। এবার দ্বিতীয় পর্যায় দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
এদিকে ঢাকায় পাকা খবর এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগে। আত্মসমর্পণ হবে বিকেল সাড়ে চারটায়। ঢাকাবাসী কী করবে আর কী করবে না বুঝে উঠতে পারছে না। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মিত্রবাহিনী ঢাকায় প্রবেশ করল। এর আগেই মিরপুর ব্রিজ দিয়ে ঢাকায় ঢুকে পড়েছে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী। পৌষের এক পড়ন্ত বিকেলে ঢাকা রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) প্রস্তুত হলো ঐতিহাসিক এক বিজয়ের মুহূর্তের জন্য। ঠিক যেখান থেকে জাতির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের সাতই মার্চ বর্জ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।
বিকেল চারটায় নিয়াজি ও অরোরা এগিয়ে গেলেন ময়দানে রাখা একটি টেবিলের দিকে। জেনারেল অরোরা বসলেন টেবিলের ডান দিকের চেয়ারে। বাম পাশে বসলেন জেনারেল নিয়াজি। দলিল আগে থেকেই তৈরি ছিল। জেনারেল অরোরা স্বাক্ষর করার জন্য দলিল এগিয়ে দেন নিয়াজির দিকে। তখন বিকেল ৪টা ২২ মিনিট। অবনত মস্তকে জেনারেল নিয়াজি দলিলে স্বাক্ষর করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিলেন স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার। দীর্ঘ নয় মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালী জাতির জীবনে এলো নতুন প্রভাত। এলো হাজার বছরের কাঙিক্ষত স্বাধীনতা।

শেয়ার