আজো গানগুলো রক্তে নাড়া দেয়: সৈয়দ আহসান কবীর

‘জন্ম  আমার ধন্য হলো মাগো’, ‘নোঙ্গর তোলো তোলো সময় যে হলো হলো’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’-এর মতো সাড়া জাগানো গানের গীতিকার নয়ীম গহরের দেহ না থাকলেও তিনি বেঁচে আছেন। তিনি বেঁচে আছেন বাঙালির রক্তে, কণ্ঠে, সুরে। শুধু তিনি নন, খান আতাউর রহমানের মতো শক্তিমান গীতিকার কলমের কালিতে শত্রুকে করেছেন ধরাসায়ী। ভাষা আন্দোলনের আগে পরে, ষেষট্টিতে, ঊনসত্তরে, সত্তরে, মুক্তির সংগ্রামে কিংবা স্বাধীনতাউত্তর জাতীয়তাবাদ বিরোধীচক্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, দেশের বিভিন্ন সংকটে, বিপ্লবী আন্দোলনে মুকুন্দ দাসের গণসংগীত ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে/ মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে’র মতো গান শক্তি যুগিয়েছে, যোগায়। গোবিন্দ হালদারের লেখায় আপেল মাহমুদের সুরে যে গান গেয়েছিলেন স্বপ্না রায়, সেই সুরে সব বাঙালিরই একই উচ্চারণ আজো প্রতিফলিত হয় আজো বাংলার আকাশে বাতাশে- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে/বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা/আমরা তোমাদের ভুলব না।’ আজো গানগুলো রক্তে নাড়া দেয়, দিয়েছিলো, দেবেও।
প্রতিরোধ মানেই গান। গান মানেই গীতিকবিতা। গীতিকবিতা মানেই চলে আসে সুর, মিশে যায় সংগীতে। এই গান, এই সুর মুক্তিকামী তরুণ-যুবা-বৃদ্ধকে আন্দোলিত করেছে বারবার। সে সময়ের মায়েরা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তার আদরের দুলালকে রাজপথে নামাতে। বুকে কষ্ট-কাফন বেঁধে সংগ্রামের হাতে তুলে দিয়েছেন, পরাধীন আঁচলকে স্বাধীন করতে। বাবা করেছেন আশির্বাদ। প্রতিটি মুহূর্ত যেখানে মৃত্যুর হাতছানি, মুক্তির সেই কঠিন পথে নিজের সাথী করে নিয়েছেন বুকের ধন তরুণ ছেলেকে।
সাহিত্যের ছন্দ-তালডাকে সৃষ্টি হয় আবেগ। সচেতন হন জনগণ। তারা হন  আন্দোলনে সম্পৃক্ত, আন্দোলনের শক্ত মঞ্চ রাজনীতিতে গিয়ে পৌঁছে। রাজনীতিতে ওঠে স্লোগান। স্লোগান মানেই কথা, কথাতে সুর-ছন্দ মেশে। তৈরি হয় সঙ্গীত। এই সংগীত, ছন্দ, কবিতা ঠিক একাত্তরের বঙ্গবন্ধুর কাব্যময় ডাকের মতো। যে ডাক মানুষের মনে নাড়া দিয়েছিলো। যে ডাকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিলো। সে ডাকে তিনি বলেছিলেন ছান্দিক কথা-কবিতা। মানুষের মনে জাগিয়েছিলেন সংগীত। সবার মুখে মুখে ছাড়িয়ে পড়েছিলো তা- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এর পরপরই বাঙালি জাতির উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর যুদ্ধকে চ্যালেঞ্জ করে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন জনতা। শত্রুপক্ষকে বিনাশ করার সংগ্রামকে উদ্দীপ্ত রাখতে গান লিখলেন কবি সিকান্দার আবু জাফর। সুর দিলেন শেখ লুৎফর রহমান। শিল্পীরা গায়লেন- ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই/আমাদের সংগ্রাম চলবেই/জনতার সংগ্রাম চলবেই…’।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নখ-দন্ত চিরতরে ভেঙে দিতে গোবিন্দ হালদারের লেখা মুক্তিযোদ্ধা আপেল মাহমুদের সুরে তারই কণ্ঠে উঠেছিলো বিপ্লবী সুর, হাজারো প্রশ্নের উত্তর- ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি/মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি/মোরা নতুন একটি কবিতা লিখতে যুদ্ধ করি/মোরা নতুন একটি গানের জন্য যুদ্ধ করি/মোরা সারা বিশ্বে শান্তি বাঁচাতে যুদ্ধ করি…’। অপর এক পৃষ্ঠায় শিল্পী আপেল মাহমুদ দেশের নবীন মানুষকে প্রতীকী করে মুক্তিযোদ্ধার মনে অনুপ্রেরণা জাগাতে উদ্দীপনামূলক গান লিখলেন। নিজেই সুরারোপ করলেন এবং কণ্ঠও দিলেন। সবাই সমসুরে গায়লেন- ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে,/আমরা ক’জন নতুন মাঝি/হাল ধরেছি শক্ত করে রে…’
সঙ্গীতের সাথে মানুষের প্রাণের টান আছে, নাড়ির সাথে আছে যোগসূত্র। তাই যুদ্ধের মাঠে স্বাধীন বাংলা বেতারের গানের তালে তালে প্রচন্ড ক্ষুধা ভুলে মায়ের আঁচলকে শত্রুমুক্ত করতে ছুটে চলেছেন দিনকে দিন। দুঃসময়কে তারা ব্যবহার করেছেন সুরের মধ্য দিয়ে। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষার জন্য গানের সুরে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গানের সুরে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। তাই প্রতি বছর একুশ এলেই জনগণের কণ্ঠে অনুরণিত হয় গীতিকবি আবদুল গাফফার চৌধুরী’র লেখা আলতাফ মাহমুদের সুরের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল রবীঠাকুরের লেখা বর্তমান জাতীয় সংগীত- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। গান বা সঙ্গীত যে মানুষকে মানুষ হতে শেখায়, তার মনে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত করে দেশের ও জাতির শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করে, দেশকে স্বাধীন করতে পারে, একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তার শ্রেষ্ঠতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্লোয়ারে গানগুলো বাজলে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে আন্দোলন-সংগ্রামের সেই দিনগুলো। সে সময়ের আমাদের অবস্থান এই পৃথিবীতে না হলেও, এই গানগুলো তা যেনো সেকালের প্রবাহমান প্রমান্যচিত্র হয়ে মনের ক্যানভাসে প্রোজেকশন করে। আর তাই ফেব্রুয়ারি, মার্চ, ডিসেম্বর এলে গানগুলোও ফিরে পায় নতুন প্রাণ।
ভাষা আন্দোলনে, গণঅভ্যুত্থানে, সর্বপরি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দেশপ্রেমিকেরা বুকের রক্তে বাংলাদেশ লিখে গিয়েছেন। তাদেরকে ইতিহাস করে রাখতে রচিত হয়েছে আরো কতো গান। কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র সুরে ছুটেছে গীতিকার মাহিনী চৌধুরীর কথা ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে/মুক্তির মন্দির সোপান তলে/কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রু-জলে। মর্টারে ছিদ্র হয়ে যাওয়া ভাইয়ের কলিজা, গোলায় উড়ে যাওয়া প্রিয়তমের হাত, মগজ ছিটকে পড়া পিতার লাশ, লুট হওয়া সম্ভ্রম নিয়ে বেঁচে থাকা বোন ইতিহাস হয়ে আছে কবিতায়, ছন্দে, গানে, সুরে। কবি মোহম্মদ মনিরুজ্জামান তার ভাই শহীদ আসাদের রক্তকে ভুলতে পারেননি। প্রচন্ড আবেগে দুলে উঠেছে তার হৃদয়। উপলব্ধি করেছেন শহীদদের আত্মত্যাগ। ‘শহীদ স্মরণে’ লিখেছেন ‘কবিতায় আর কি লিখব?/যখন বুকের রক্তে লিখেছি/একটি নাম/বাংলাদেশ’।
যে ছন্দ, যে গান আজো মনে নাড়া দিয়ে যায়, তার ভাষা বেঁচে থাকুক মানুষের মুখে, কলমে। বাংলাদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়–ক বিশ্বময়। ভাষার ইতিহাসে পৃথিবীতে বিশেষ স্থান নিক। রবীন্দ্র পরে এই ভাষায় আরো সাহিত্যিক তাদের কাজের স্বীকৃতি পাক।
সাহিত্য এগিয়ে যাক কবিতায়, সুরে, ছন্দে, তালে, সংগীতে। সেই ভাষা রূপ নিক বিজয়ের। স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া সরকারের মতো ভুলুন্ঠিত হোক স্বদেশী বিশ্বাসঘাতকেরা। অটুট থাকুক বাঙালির মন থেকে মনের বিনে সূতোর টান। উজ্জীবিত থাকুক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, জাতীয়তাবোধ- দেশাত্মবোধক গানে, জাগরণী গানে, উজ্জীবনের গানে, গণ ও রণসঙ্গীতে। নতুনভাবে কবিকণ্ঠ উচ্চারিত হোক সবার কণ্ঠে- ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। বাংলার সব শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মুক্তিযোদ্ধা কবি-গীতিকার ফজল-এ-খোদার কথায় শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই- ‘সালাম সালাম হাজার সালাম/ সকল শহীদ স্মরণে,/ আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই/তাদের স্মৃতির চরণে…

লেখক : কবি, গীতিকার, কথাশিল্পী

SHARE